কান পেতে রই | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমি তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন যোগ দিয়েছি। একদিন বিকেলে আমার বিভাগের একজন ছাত্র আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, ছাত্রটির উদভ্রান্তের মতো চেহারা, শূন্য দৃষ্টি। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আমার আত্মহত্যা করার ইচ্ছে করছে!’ ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’ ছাত্রটি কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। শুধু বুঝতে পারলাম কোনো একটা দুর্বোধ্য কারণে সে তীব্রভাবে হতাশাগ্রস্ত, মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত। কীভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা হতাশাগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের হতাশা থেকে টেনে বের করে আনতে হয়, আমার জানা নেই। শুধু কমনসেন্স ব্যবহার করে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি, তাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করেছি, শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সে যখন চলে যাচ্ছে আমি তখন তাকে বলেছি, ‘তোমার আবার যদি কখনও আত্মহত্যা করার ইচ্ছে করে আমার কাছে চলে এসো।’

ছেলেটি মাঝে মধ্যেই আসত। শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলত, ‘স্যার আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে।’ আমি তখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম, সাহস দিতাম। ছাত্রটি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেনি- পাস করে বের হয়েছে। কিন্তু আমার একটি ছাত্রী আত্মহত্যা করেছিল – এতদিন হয়ে গেছে আমি তবু সেই ঘটনাটির কথা ভুলতে পারি না। এখনও যখন কোনো একটি ছাত্র বা ছাত্রী আমার অফিসে ঢুকে শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘স্যার, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে’ আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমি জানি, সাহস করে কিংবা মরিয়া হয়ে যে একজন-দু’জন ছাত্রছাত্রী আমার কাছে আসে তার বাইরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী আছে, যারা কোনো কারণ ছাড়াই হতাশাগ্রস্ত, নিঃসঙ্গ কিংবা আত্মহত্যাপ্রবণ। তারা কী করবে বুঝতে পারে না, কোথায় সাহায্য পাবে জানে না। আমাদের সবার অজান্তে তারা বিচিত্র এক ধরনের যন্ত্রণায় ছটফট করে। একজন শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা আমরা সবাই জানি। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও তাকে যে একটু সেবা দিয়ে স্বাভাবিক করে তুলতে হয়, সেটা কিন্তু আমরা এখনও জানি না।

Continue reading

Advertisements

আমার দেখা গণজাগরণ মঞ্চ | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সবারই নিশ্চয়ই সেই দিনটার কথা মনে আছে। কাদের মোল্লার বিচারের রায় হয়েছে। সব অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, যে কোনো একটা অপরাধের জন্যেই দশবার ফাঁসি দেয়া যায় কিন্তু কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের সকল মানুষের ভুরু একসাথে কুঁচকে গেল, তাহলে কী এই পুরো বিচারের বিষয়টা আসলে একটা প্রহসন? নাকি বিচারকদের ভেতরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব? সরকার কী যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে আন্তরিক? আমাদের বয়সী মানুষের লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া করার কিছু নেই। তাই আমরা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কাজে মন দেয়ার চেষ্টা করলাম।

কিছুক্ষণের মাঝে আমার অফিসে ছাত্রছাত্রীরা আসতে শুরু করল। তারা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে থাকতে রাজি না। আমার কাছে জানতে চায় কী করবে? আমি জানি, তরুণদের ভেতরে যখন ক্রোধ ফুঁসে উঠে, তখন সেটাকে বের করে দেয়ার একটা পথ করে দিতে হয়। কীভাবে তারা তাদের ক্রোধটাকে বের করবে জানে না- আমিও জানি না। তারা নিজেরাই একটা পথ বের করে নিল, যখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে তখন দলবেধে ক্যাম্পাসে শ্লোগান দিতে শুরু করল। আমি ভাবলাম এখন হয়তো তাদের ক্রোধটা একটু প্রশমিত হবে।

আমি তার মাঝে খবর পেতে শুরু করেছি ঢাকার শাহবাগে কিছু তরুণ এসে জমা হয়েছে। তারা দাবি করছে যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীর সঠিক বিচার না হবে, তারা ঘরে ফিরবে না। শুনে আমার বেশ ভালো লাগল- তারা সরকারের কাছে দাবি করে যুদ্ধাপরাধীদের সত্যিকারভাবে বিচার করে ফেলতে পারবে সে জন্যে নয়। এই দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে এত তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে, সেই বিষয়টি আমার জন্যে নতুন এক ধরণের উপলব্ধি।

Continue reading

একাত্তরের দ্বিতীয় পাঠ | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আজকাল চিঠি লেখালেখি খুব কমে এসেছে- চিঠি লিখে যে কথাটি জানাতে হবে টেলিফোন করে অনেক তাড়াতাড়ি সে কথাটি জানিয়ে দেয়া যায়। এস.এম.এস কিংবা ই-মেইল আছে, ফেসবুক আছে, তাই কে আর এতো সময় নিয়ে চিঠি পাঠাবে। আমার ধারণা আমি সম্ভবত এই দেশে অল্প কয়েকজন সৌভাগ্যবান মানুষের একজন, যে এখনও নিয়মিত চিঠি পাই! আমার চিঠিগুলো খুব মজার হয় কারণ তার বেশিরভাগই লেখে ছোটো ছোট ছেলেমেয়েরা।

প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ শুরু হবার পর চিঠিগুলোকে মোটামুটি দুই ভাবে ভাগ করা যায়। একভাগ লিখছে যারা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আসতে পারছে তারা, অন্যভাগে রয়েছে যারা আসতে পারছে না তারা। যারা আসতে পারছে না, তাদেরকেও আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়; একভাগে রয়েছে যারা ঢাকার বাইরে থাকে তারা- অন্যভাগে রয়েছে সবচেয়ে ক্ষুব্ধ অংশটুকু। তারা ঢাকায় থাকে, ইচ্ছে করলেই তারা শাহবাগ আসতে পারে, কিন্তু তাদের মা-বাবা আত্মীয়স্বজন তাদের আসতে অনুমতি দিচ্ছে না! আমার কাছে তারা লম্বা চিঠি লিখে সেই দুঃখের কাহিনী জানায়।

Continue reading