বাজিয়ে যাই ভাঙা রেকর্ড | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.
বেশ কয়েক বছর আগে একজন তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল, ‘আমি অমুক।’ বলাই বাহুল্য, আমি তার নাম থেকে তাকে চিনতে পারলাম না। তখন তরুণটি বলল, ‘আপনি আমার বাবাকে চিনতে পারেন। নকল করার সময় ধরে ফেলেছিলেন বলে একটা ছাত্র চাকু মেরে আমার বাবাকে খুন করে ফেলেছিল।’

সঙ্গে সঙ্গে আমি তরুণটিকে চিনতে পারলাম। তার শিক্ষক বাবার হত্যাকাণ্ডের খবরটি খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল। নকল ধরার জন্যে একজন শিক্ষককে খুন করে ফেলার ঘটনাটি শুধু আমার নয়, সারাদেশের সব মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। একজন ছাত্র যখন পরীক্ষায় নকল করা শেখে এবং সেটাকে তার অধিকার মনে করে, তখন সেটা খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। Continue reading

Advertisements

বুকের ভেতর ঘৃণার আগুন |মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১৯৭১ সালের মে মাসের ৫ তারিখ বিকালবেলা পিরোজপুরের বলেশ্বরী নদীর ঘাটে পাকিস্তান মিলিটারি আমার বাবাকে গুলি করে হত্যা করেছিল। পুলিশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা হিসেবে শুধু আমার বাবাকেই নয়, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা হিসেবে জনাব আব্দুর রাজ্জাক এবং জনাব মীজানুর রহমানকেও একই সঙ্গে গুলি করে তাদের সবার মৃতদেহ বলেশ্বরী নদীতে ফেলে দিয়েছিল।

পিরোজপুরের নদীতে জোয়ার-ভাটা হয় তাই এই তিনজন তেভাগ্য মানুষের মৃতদেহ দিনে দুইবার জোয়ারের পানিতে উত্তরে এবং ভাটার পানিতে দক্ষিণে নেমে আসছিল। তিন দিন পর আমার বাবার মৃতদেহ কাছাকাছি একটা গ্রামের নদীতীরে এসে আটকে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষরা আমার বাবাকে চিনত, তাদের মনে হলো, ‘আহা, এই মৃতদেহটি মাটি চাইছে।’ তাই তারা ধরাধরি করে আমার বাবার মৃতদেহটি তুলে নদীতীরে কবর দিয়েছিল। অন্য দুজনের সেই সৌভাগ্য (!) হয়নি এবং তাদের মৃতদেহ শেষ পর্যন্ত নদীতে ভেসে হারিয়ে গিয়েছিল।

Continue reading

বিশ্ববিদ্যালয় | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.
বছরের এই সময়টা মনে হয় দীর্ঘশ্বাসের সময়, এই সময়টিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলো হয়। খুব সহজেই সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা ভর্তি পরীক্ষা নিতে পারত, কিন্তু তারপরও কিছু বাড়তি টাকা উপার্জন করার জন্য প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। বছরের এই সময়টা দেশের ছেলেমেয়েরা একেবারে দিশাহারা হয়ে দেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় পাগলের মতো ছুটে বেড়ায়। পরীক্ষার সময় কিছু জাল পরীক্ষার্থী ধরা পড়ে, কিছু হাইটেক নকলবাজ ধরা পড়ে। যে কয়জন ধরা পড়ে তার তুলনায় নিশ্চিতভাবেই অনেকে ধরা পড়ে না-সেটি নিয়ে খুব ব্যস্ত হওয়ারও কিছু নেই। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার পরও সরকার বা কর্মকর্তারা চোখ বুজে থেকেছেন। বড় অন্যায় দেখেও যদি চোখ বুজে থাকি তাহলে কিছু ‘সৃজনশীল’ নকলবাজ যদি পুরো ভর্তি প্রক্রিয়াকে কাঁচকলা দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যায় তাহলে সেটা নিয়ে হইচই করার কী আছে? আমরা তো রাষ্ট্রীয়ভাবেই ঠিক করে নিয়েছি লেখাপড়া একটা গুরুত্বহীন বিষয়! Continue reading

বইমেলার টুকিটাকি | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

০১.

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন ঈদের পুরোদিন শেষ করে রাতে যখন ঘুমাতে যেতাম, তখন দুঃখে বুকটা ভেঙে যেত। মনে হতো- হায়রে, এতো আনন্দের ঈদটা শেষ হয়ে গেল? এখন বয়স হয়েছে, ঈদের রাতে ঘুমানোর সময় দুঃখে বুক ভেঙ্গে যায় না। কিন্তু যখন বইমেলা শেষ হয়ে যায়, তখন বুকটা টনটন করতে থাকে! আমার শৈশবের ঈদের রাতের কথা মনে পড়ে যায়।

এই লেখাটি যখন ছাপা হবে, সেদিন বইমেলার শেষ দিন। আমাদের এই বইমেলাটি খুবই চমকপ্রদ। প্রকাশকরা চাপাচাপি করে যদি বাংলা একাডেমিকে রাজি করিয়ে সেটাকে আরও লম্বা করে মার্চ মাসে নিয়ে যায়, তাহলে আবিষ্কার করবে কেউ মেলায় আসছে না। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনেও রীতিমত ধাক্কাধাক্কি করে মেলায় যাবে কিন্তু মার্চ মাসে ফ্রি চা কফি খাওয়ালেও কেউ মেলায় যাবে না। ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া অন্য মাসে বইমেলা ব্যাপারটা যেন রীতিমত অন্যায় একটা ব্যাপার! কী আশ্চর্য্য একটা ঘটনা, এই দেশ ছাড়া আর কোনো দেশে এরকম বিচিত্র ব্যাপার নিশ্চয়ই দেখা যায় না!

এবারের বইমেলাটা একটু অন্যরকম ছিল। প্রথমবার বইমেলাটি শুধু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ না রেখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রথমবার যখন আমি বইমেলায় গিয়েছি সাংবাদিকেরা সবাই আমাদের জিজ্ঞেস করেছে, মেলার এই নতুন কাঠামো সম্পর্কে আমাদের কী ধারণা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের খালি জায়গা কমতে কমতে এত ছোট হয়ে গেছে যে, বইমেলায় প্রকাশকদের জায়গা দেওয়াটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা যখন শুনেছি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও মেলাটা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন আমি বেশ খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু প্রথমদিন মেলায় গিয়ে আমার একটু আশাভঙ্গ হয়েছিল। তার কারণ আমাদের বইমেলাটা একটু অন্যরকম, এটা কখনই শুধু বই বিক্রি করার একটা আয়োজন ছিল না। এটা ছিল একটা উৎসবের মতো, মানুষজন ঘুরছে ফিরছে, বেড়াচ্ছে, কথা বলছে, চিনাবাদাম খাচ্ছে, গান শুনছে, লেখকের অটোগ্রাফ নিচ্ছে এবং তার মাঝে যদি ইচ্ছে করে তাহলে বই নেড়েচেড়ে দেখছে। যদি পছন্দ হয় (পকেটে টাকা থাকে) তাহলে বেই কিনছে। কিন্তু এবারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশটুকুতে গিয়ে মনে হলো, আমরা বইমেলায় আসিনি, আমরা এসেছি বই বিক্রি করার কিছু স্টলে! বইমেলার যে একটা মধুর ভাব থাকার কথা সেটি নেই, এখানে কোন কালচার নেই, যা আছে তা হচ্ছে বাণিজ্য! Continue reading