দেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সর্বনাশ করল কে | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


১.

আমি জানি এই মুহূর্তে দেশের মানুষ এই প্রশ্নের উত্তরে বেগম খালেদা জিয়ার নাম বলবে। দেশের মানুষকে দোষ দেওয়া যাবে না; কারণ টানা হরতালের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের। যারা কট্টর বিএনপি কিংবা জামাতপন্থী, তারা অবশ্যি গলার রগ ফুলিয়ে বলবে, সব দোষ এই সরকারের। এই সরকার যদি গোয়ার্তুমি না করত তাহলেই তো পেট্রোল বোমা ফাটাতে হত না, হরতাল ডাকতে হত না।

রাজনীতির মাঠের ব্যাপারগুলো আমি মোটেও বুঝি না। মান্না-খোকার টেলিফোন আলাপটি প্রকাশ হবার পর বলা যেতে পারে আমি প্রথমবার মাঠের রাজনীতি খানিকটা বুঝতে পেরেছি। মাঠের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের কী হচ্ছে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না এবং আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে যেটাকে খুবই খারাপ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়, মাঠের রাজনীতিতে সেটা আসলে হয়তো খুবই ভালো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত!

এই যে আমরা ভাবছি দিনের পর দিন হরতাল ডেকে দেশের যাবতীয় সর্বনাশ করার সাথে সাথে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে বিএনপি ধীরে ধীরে সবার মনে বিষিয়ে দিচ্ছে, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, সেটা হয়তো শুধু আমাদের ধারণা। বিএনপির নেতা-নেত্রীরা হয়তো জানেন, এটা আসলে প্রায় উনসত্তরের গণআন্দোলনের মতো বিশাল মহান একটি সফল আন্দোলন। কাজেই এসব ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই, দর্শক হিসেবে পুরো ব্যাপারটা দেখা ছাড়া আর কোনো কিছু করারও নেই।

কোনো কিছু বলার এবং করার না থাকলেও কিছু কিছু বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল না দেওয়ার জন্যে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অনেক অনুনয়-বিনয় করেছেন, বলা যেতে পারে আক্ষরিক অর্থে শুধুমাত্র পা ধরতে বাকি রেখেছেন। কিন্তু বিএনপির (এবং তাদের সাথে থাকা অন্য দলগুলোর) মন গলেনি। দিনের পর দিন হরতাল ডাকা হয়েছে এবং একটার পর একটা পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে, পিছিয়ে দিতে হয়েছে। প্রায় পনেরো লক্ষ কিশোর-কিশোরী, তাদের ত্রিশ লক্ষ বাবা-মা এবং কোটি খানেক আপনজন গত দুই মাস নিয়মিতভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়েছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় একই সময়ে ‘ও’ লেভেল পরীক্ষার তারিখ পড়েছিল এবং তখন কিন্তু তাদের পরীক্ষার জন্যে অবরোধে ছাড় দেওয়া হয়েছিল (২১ জানুয়ারি ২০১৫, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)। আমার প্রশ্নটি খুবই সহজ, যারা ‘ও’ লেভেল (কিংবা ‘এ’ লেভেল) পরীক্ষা দিচ্ছে তারাও বাংলাদেশের ছেলেমেয়ে; বিএনপি তাদের জন্যে যদি ছাড় দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের অন্য ছেলেমেয়েদের জন্যে কেন ছাড় দেওয়া হবে না? বরং বলা যেতে পারে, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে সংখ্যায় তারা অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, তাদের মাঝে আছে এই দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা, মফস্বল আর গ্রামের ছেলেমেয়েরা।

আমি ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তা করে হাল ছেড়ে দিয়েছি। বিষয়টি হয়তো বোঝার জন্যে খুবই সহজ, কিন্তু গ্রহণ করার জন্যে খুবই কঠিন। এই দেশ যারা চালায় এবং অচল করে রাখে, দুই দলের কর্তাব্যক্তিরাই আসলে উচ্চবিত্তের মানুষ। তাদের ছেলেমেয়েরা সম্ভবত এসএসসি পরীক্ষা দেয় না; তারা সম্ভবত ইংরেজি মিডিয়ামে ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেলে পড়ে। কাজেই দেশ যদিও-বা গোল্লায় যায়, অন্তত নিজেদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষাটা যেন ঠিকমতো দেওয়া যায় সে জন্যে এই ব্যবস্থা। কিন্তু আমি যেটুকু জানি, তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, ইংরেজি মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরাও প্রায় সমানভাবে ভুগছে।

যাই হোক, এটুকু ছিল আমার ভূমিকা, এবারে আসল বক্তব্যে আসি।

২.

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যেভাবে দেশের লেখাপড়া আক্ষরিক অর্থে পঙ্গু করার সংগ্রামে নেমেছেন সেটাকে তাদের দলের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র পেট্রোল বোমার আক্রমণের সাথে তুলনা করা যায় (যারা বিএনপির রাজনীতি সমর্থন করেন তারা সম্ভবত আমার এককভাবে একজনের নাম উল্লেখ করায় একটু বিরক্ত হচ্ছেন; কারণ কাগজে-কলমে এটি বিশটি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত, একজনকে দায়ী করা ঠিক না। কিন্তু আমরা সবাই জানি, যদিও পুরো আন্দোলনটি করা হচ্ছে গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্যে, কিন্তু এই দলগুলোতে গণতন্ত্রের ‘গ’ও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবকিছুই একজনের সিদ্ধান্ত, সে জন্যে আমিও একজনের নাম লিখছি)।

পেট্রোল বোমা যে রকম খুব দ্রুত একজনকে ধরাশায়ী করে ভয়ংকর যন্ত্রণা দিতে পারে, ঠিকভাবে পোড়াতে পারলে আক্রান্ত মানুষটি খুব কষ্ট পেয়ে মারা যায় এবং যদি কোনোভাবে বেঁচে যায় তাহলে যে রকম সারা জীবনের জন্যে একটা ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয়, হরতাল অবরোধ দিয়ে লেখাপড়া আক্রমণ করাও অনেকটা সে রকম। সপ্তাহের পাঁচদিন স্কুল-কলেজে না গিয়ে মাত্র দুইদিনে ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করলে খুব দ্রুত সেই একই রকম ক্ষতি হয়। যদি-বা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়ে ছেলেমেয়েরা পাশ করেও ফেলে, এই দীর্ঘ দুই মাসের ক্ষতিটুকু কিন্তু তাদের সারা জীবন বহন করতে হবে।

তবে আমি আজকে লেখাপড়ার উপর এই নিষ্ঠুর আক্রমণের কথা বলার জন্যে কাগজ-কলম নিয়ে বসিনি, আমি সবার অগোচরে খুব ধীরে ধীরে লেখাপড়ার ওপর যে ‘স্লো পয়জনিং’ হচ্ছে তার কথা বলতে বসেছি। তবে মূল বক্তব্যের আগে আমাকে একটু পুরানো ইতিহাস বলতে হবে।

সেই যখন থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষক হয়েছি, তখন থেকে আমি জানি একজন ছেলে বা মেয়ে কী শিখেছে তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার শেখার আগ্রহ আছে কী না, শেখার ক্ষমতা আছে কী না সেই বিষয়টি। এই দেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে আমার দুঃখের সীমা ছিল না। লেখাপড়ার নামে তাদেরকে কিছু জিনিস মুখস্ত করানো হত, পরীক্ষার হলে গিয়ে সেটা তাদের উগড়ে দিতে হত। পড়াশোনার পুরো বিষয়টা ছিল খুব কষ্টের, কারণ মানুষের মস্তিষ্ক মোটেও কোনো কিছু মুখস্ত করার জন্যে তৈরি হয়নি। মানুষের মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে বোঝার জন্যে, জানার জন্যে কিংবা বিশ্লেষণ করার জন্যে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মনে রাখার বিষয়টা মানুষের থেকে ভালো পারে শিম্পাঞ্জিরা।

তাই প্রথম যখন সৃজনশীল পদ্ধতির পরীক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছিল আমার আনন্দের সীমা ছিল না (তখন অবশ্যি সেটাকে বলা হত, ‘কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতি’, কিন্তু ‘কাঠামোবদ্ধ’ নামটা কেমন যেন খটমটে মনে হয়েছিল বলে পাল্টে ‘সৃজনশীল’ করে দেওয়া হয়েছিল)। যাই হোক, সৃজনশীল প্রশ্নের মূল বিষয়টা ছিল খুবই সহজ, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে আর কখনও ছাত্রছাত্রীদের কিছু মুখস্ত করতে হবে না। তারা যদি পুরো বইটা মন দিয়ে পড়ে তাহলেই হবে, প্রশ্নগুলোর উত্তর তারা ভেবে ভেবে দিতে পারবে।

নূতন কিছু শুরু করা খুবই কঠিন, এখানেও সেটা দেখা গেল। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি শুরু করা মাত্রই অভিভাবকেরা এর পিছনে লেগে গেলেন। স্বার্থপর অভিভাবকদের একটা মাত্র কথা, “স্বীকার করি এটা খুবই ভালো পদ্ধতি, কিন্তু আমার ছেলে কিংবা মেয়ে আগের পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে যাক, তারপর এই পদ্ধতি প্রবর্তন করা হোক!”

তারা সৃজনশীল পদ্ধতির বিরুদ্ধে রীতিমতো আন্দোলন শুরু করে দিলেন। আমার মনে আছে, আমার যারা ছাত্রছাত্রীদের মুখস্ত করার যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করার এই সুযোগটা পেয়ে লুফে নিয়েছিলাম, তারা সবাই মিলে সেটা রক্ষা করার জন্যে উঠেপড়ে লেগে গিয়েছিলাম। রীতিমতো যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত সারা পৃথিবীর ছেলেমেয়েরা যে পদ্ধতিতে (Bloom’s taxonomy) লেখাপড়া করে, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাও সেই পদ্ধতিতে লেখাপড়া করার এবং পরীক্ষা দেওয়ার একটা সুযোগ পেল। অন্যদের কথা জানি না, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন এই ছেলেমেয়েদের আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিজের ছাত্রছাত্রী হিসেবে পাব। কারণ, এই ছাত্রদের মস্তিষ্কগুলো থাকবে সতেজ, তীক্ষ্ম এবং সৃজনশীল; মুখস্ত করিয়ে করিয়ে সেগুলো ভোঁতা করিয়ে দেওয়া হবে না।

কিছুদিনের ভেতরে আমি প্রথম দুঃসংবাদটি পেলাম, সেটি হচ্ছে যে, সৃজনশীল প্রশ্নের গাইড বই বের হয়ে গেছে। খবরটি ছিল আমার কাছে অবিশ্বাস্য; কারণ সৃজনশীল প্রশ্নটাই করা হয়েছে যেন ছাত্রছাত্রীদের আর প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করতে না হয় সে জন্যে। তার থেকেও আরও ভয়াবহ ব্যাপার ঘটতে থাকল, শুধু যে বাজারে গাইড বই বের হতে থাকল তা নয়, আমাদের দেশের বড় বড় পত্রিকাগুলোও ‘শিক্ষা পাতা’ বা এ ধরনের নাম দিয়ে তাদের পত্রিকায় গাইড বই ছাড়াতে শুরু করল! এগুলো হচ্ছে সেই পত্রিকা যারা এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। দেশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রীতিমতো সংগ্রাম করে! পত্রিকার মূল কাজ সংবাদ ছাপানোর পাশাপাশি তারা জ্ঞান, বিজ্ঞান, আর্ট, কালচার নিয়ে ঠেলাঠেলি করে দেশকে এগিয়ে নেবার জন্যে জান কোরবান করে দেয়!

আমার খুব ইচ্ছে এই সকল পত্রিকার ‘মহান’ সম্পাদকদের সাথে কোনো দিন মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করি তারা কেমন করে এই দেশের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এত বড় প্রতারণা করেন (আমার মনে আছে আমি কোনো একটি লেখায় এই ধরনের একটা পত্রিকার গাইড বইয়ের উদাহরণটি তুলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যদি গাইড বই ছাপানো বেআইনি হয় তাহলে পত্রিকায় গাইড বই ছাপানো কেন বেআইনি হবে না, আমরা কেন এই পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারব না)।

যাই হোক, বাজারে এবং দৈনিক পত্রিকায় গাইড বই বের হওয়ার পর থেকে অনেক শিক্ষকই স্কুলের পরীক্ষায় এই গাইড বই থেকে প্রশ্ন তুলে দিতে শুরু করলেন। সেই সব শিক্ষকদের ছাত্রছাত্রীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এক সময় শুধু পাঠ্য বইয়ের প্রশ্নগুলো উত্তর ‘মুখস্ত’ করলেই চলত; এখন তাদের তার সাথে সাথে পুরো গাইড বইয়ের প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করা শুরু করতে হল।

আমি পড়লাম মহাবিপদে। এই দেশের ছেলেমেয়েদের অনেকেই জানে আমি এই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি যেন শুরু হতে পারে তার জন্যে অনেক চেঁচামেচি করেছি। তারা সরাসরি আমাকে অভিযোগ করতে শুরু করল। আমি তখন তাদের বুঝিয়ে বলতাম, যদি দুই নম্বরি শিক্ষক হয়, তাহলে সৃজনশীল গাইড বই পড়ে হয়তো স্কুলের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি কিংবা এইচএসসির প্রশ্নগুলো কখনও কোনো গাইড বই থেকে আসবে না। পরীক্ষার আগে এই প্রশ্নগুলো প্রথমবার তৈরি করা হবে। কাজেই যারা গাইড বই মুখস্ত করবে, সত্যিকারের পরীক্ষায় তাদের কোনো লাভ হবে না। বরং উল্টো ব্যাপার ঘটবে, মুখস্ত করে করে পরীক্ষা দেওয়ার কারণে তারা আসল পরীক্ষাগুলোতে নিজে নিজে ভাবনা-চিন্তা করে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাবে।

এতদিন আমি ছাত্রছাত্রীদের এভাবে বুঝিয়ে এসেছি এবং তারাও আমার যুক্তি মেনে নিয়েছে। এই বছর হঠাৎ করে আমি প্রথমবার সত্যিকারের বিপদে পড়েছি, আমার কাছে একজন এসএসসির বাংলা প্রশ্নপত্র পাঠিয়েছে, সেই প্রশ্নে গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দেওয়া আছে। প্রমাণ হিসেবে সে গাইড বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোও ফটোকপি করে দিয়েছে। ২০১৪ সালে যখন এইচএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে শুরু করল তখন কিছুতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করতে রাজি হয়নি যে, ব্যাপারটি আসলেই ঘটেছে।

আমি এবারে এসএসসির প্রশ্ন এবং গাইড বইয়ের প্রশ্ন পাশাপাশি দিয়ে দিচ্ছি, পাঠকেরা নিজের চোখেই দেখতে পাবেন। শুধু এই দুটি নয়, আরও অনেকগুলো প্রশ্ন আছে, লেখার শেষে আমি লিংক দিয়ে দিচ্ছি, যার ইচ্ছে ডাউনলোড করে সেগুলো নিজের চোখে দেখে নিতে পারবেন।

এর চাইতে ভয়ংকর কোনো ব্যাপার কি কেউ কল্পনা করতে পারবে? যারা গাইড বই ছাপায়, আনন্দে তাদের বগল বাজানোর শব্দ কি সবাই শুনতে পাচ্ছেন? সেই শব্দ কি শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পৌঁছাবে? এই গাইড বই বিক্রেতারা কি এখন খবরের কাগজ, রেডিও, টেলিভিশনে বড় বড় করে বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না? সেখানে তারা ঘোষণা করবে, “আমাদের গাইড বই বাজারের সেরা, এখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন বেছে নেওয়া হয়!”

যত স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি শুরু করা হয়েছিল, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার (নাকি দুর্নীতি?) কারণে এখন কি পুরো বিষয়টা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে না? শিক্ষা বোর্ডের কাছে নিশ্চয়ই রেকর্ড আছে; তারা খুব ভালোভাবে জানেন কারা এই প্রশ্ন করেছে। আমরা কি আশা করতে পারি না, যে সকল প্রশ্নকর্তা এই দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়ার পুরোপুরি সর্বনাশ করে দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতে যেন আর কখনও এ রকম ঘটনা না ঘটে তার একটা গ্যারান্টি দেবেন?

কারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে তাদেরকে কখনও ধরা যায়নি, কিন্তু কারা গাইড বই থেকে প্রশ্ন নিয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করেন, তাদের ধরতে তো কোনো সমস্যা নেই! মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যেভাবে জোড় হাত করে বেগম খালেদা জিয়ার কাছে অনুরোধ করেছিলেন এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল না দিতে, ঠিক একইভাবে জোড় হাত করে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করব, এসএসসি পরীক্ষায় গাইড বই থেকে প্রশ্ন তুলে না দিতে।

গাইড বই থেকে তুলে দেওয়া প্রশ্ন দিয়ে তৈরি করা এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নের পাশাপাশি ভিন্ন আরও একটি প্রশ্নপত্র আমার হাতে এসেছে। এই প্রশ্নটি জাতীয় কারিকুলামে ইংরেজি মাধ্যমের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র। প্রশ্নপত্রটির খানিকটা অংশ আমি এই লেখার সাথে যুক্ত করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। জানি না সেটা পত্রিকায় দেখানো সম্ভব হবে কী না। লেখার শেষে আমি এটারও লিংক দিয়ে দিচ্ছি, যে কেউ সেটা ডাউনলোড করে পুরোটা দেখে নিতে পারবেন।

এসএসসি পরীক্ষায় গাইড বই থেকে নেওয়া প্রশ্ন দেখে আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি, কিন্তু ইংরেজিতে লেখা পদার্থ বিজ্ঞানের এই প্রশ্নটি দেখে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গিয়েছে। একটা এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ইংরেজি ভাষার এই নমুনা দেখেও আমার বিশ্বাস হতে চায় না, কেমন করে শিক্ষা বোর্ড ছাত্রছাত্রীদের হাতে এই প্রশ্ন তুলে দিল? প্রত্যেকটি প্রশ্ন ভুল ইংরেজিতে লেখা, ছোটখাট ভুল নয়, উৎকট ভুল। যেমন, Who is invented air pump? How many power of an electric fan? which mirror use of aolar oven? ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রশ্নটি দেখেই বোঝা যায় এটি আসলে চরম হেলাফেলায় একটা উদাহরণ। ইংরেজি কারিকুলামের প্রশ্ন করার জন্যে শুদ্ধ ইংরেজি লিখতে পারে এ রকম একজন শিক্ষক এই দেশে নেই তা হতে পারে না। এর অর্থ, যারা এর দায়িত্বে আছেন তাদের লজ্জা-শরম বলে কিছু নেই। আমরা যারা এটা দেখি তারা লজ্জায় মুখ দেখাতে পারি না। যারা এই কাজটি করেন তারা একটুও লজ্জা পান না, বরং বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম বেগম খালেদা জিয়া তার দলবল নিয়ে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার যে ক্ষতি করেছেন সেটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে কী না আমরা জানি না।

সেই সাথে আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, বেগম খালেদা জিয়ার মতো রাতারাতি সর্বনাশ না করলেও খুব ধীরে ধীরে এই দেশের শিক্ষার সর্বনাশ করার কাজটি কিন্তু করে যাচ্ছে যাদের উপর আমরা এই দেশের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দায়িত্ব দিয়েছি, তারাই!

আবার হাত জোড় করে বলছি, বাচাঁন, আমাদের ছেলেমেয়েদের সর্বনাশ থেকে বাঁচান!

লিংক দুটো হচ্ছে:

১. guide

২. eng

Advertisements

5 thoughts on “দেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সর্বনাশ করল কে | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

  1. জাফর স্যারের সাথে দ্বিমত পোষণ করার কোন জায়গা নেই অথবা তিনি সেই জায়গাটুকু রাখেনও না।তবে একটু যোজন করতে হচ্ছে শিক্ষার জন্যই।স্যার যে কথাগুলো বলেছেন তা বাস্তব সত্য।তবে এর বাইরে গেলে এটাও সত্য যে শুধু মন্ত্রনালয় বা দায়িত্বশীলরাই এই অবস্থার জন্য দ্বায়ী নয়,পাশাপাশা শিক্ষক ও অভিবাবকরাও অনেকাংশে দ্বায়ী। আমি মিথ্যা বলছি না,আমার ছোটভাই গতবার পিএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।১ম পরীক্ষার পরে আমার মা আমাকে ফোনে বললেন ইন্টারনেটে নাকি প্রশ্ন পাওয়া যাচ্ছে,তুঁই একটু দেখ না?আমি বললাম ছেলেকে কি চুরি শিখাইতেছ? মা লজ্জা পেলেন,হয়তো বড় ছেলের কথায় কষ্টও পেয়েছেন,প্রকাশ করেন নি।পরক্ষনেই বললেন,রিংকু বলছে সে নাকি প্রশ্ন এনে দিবে,তাকেও তাহলে মানা করে দিচ্ছি।এখানে রিংকু মশাই হচ্ছেন একজন হাউজ টিউটর এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।আমার ভাই প্রশ্ন পায় নি।পায়নি জিপিএ ৫ ও।তবে কোনরকমে বৃত্তি পেয়েছে।খারাপ না।তবে দুঃখ একটাই,জাফর স্যার এইসব রিংকুদের ব্যাপারে কিছুই বলেন না।

    আমার কলেজ জীবনের কাহিনী।পড়াশুনায় তেমন আহামরি কেউ ছিলাম না।এইচ এস সি পরীক্ষার কেন্দ্র পড়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত একটি কলেজে।ব্যাবহারিক পরীক্ষার আগে ঘোষণা দেয়া হল ব্যবহারিকে ভাল মার্ক পেতে হলে প্রতি সাবজেক্টের ২৫০ করে মোট ১০০০ টাকা ওই স্কুলে দিতে হবে।ভাবলাম যেহেতু মার্কের ব্যাপার টাকা দিয়েই দিই।দিলামও।সঠিক মনে পড়ছে না,কিন্তু কোন একটা ব্যাবহারিক পরীক্ষার মৌখিক অংশে প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করেছিলান,বাসা কোথায়?উনাদের কলেজে ছাত্র ভর্তি করাতে পারবো কি না?ভর্তি করালে উনি প্রত্যেক সাবজেক্টে ২৫ করেই মার্ক দিয়ে দিবেন।ছাত্রও ভর্তি করাতে পারি নি,জিপিএ-৫ ও পাওয়া হয় নি।হয়তো ১০০০ টাকাও বিফলে গেছে।পরীক্ষা ততটা খারাপও হয়নি।সেই আক্ষেপে সাইন্সই ছেড়ে দিয়েছি।দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে ব্যাবহারিক নিয়ে এইসব কার্যকলাপ প্রায় স্কুল কলেজেই হয়ে থাকে।এইগুলার দিকে স্যার নজর দিলে হয়তো ভাল হতো।

    শিক্ষকদের আরেকটি কুকর্মের কথা না বললেই নয়।যতটুকু জানি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন কয়েকজন শিক্ষক মিলে তৈরি করেন।সেই হিসেবে ঢাকা কলেজ এর গণিতের এক শিক্ষকও খুব সম্ভবত সেই সৌভাগ্যের অধিকারী।সেই শিক্ষকের আবার জমজমাট কোচিং ব্যাবসা।বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম উনি নাকি পরীক্ষার আগে ২ সেট প্রশ্ন দেন।সেখান থেকেই নাকি সব চলে আসে।এই ব্যাপারে নাকি উনার বিরাত সুনাম।একটু খোজ নিলে জাফর স্যারও হয়তো উনার এই পরিচিতি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন।

    আমরা আসলে কি করবো?শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে দেখি অনেক চেষ্টা করতে।তিনি বিফল।আপনয়াকেও দেখি,অপ্রিয় সত্য আপনিও বিফল।কে শুনে কার কথা।প্রশ্নকর্তা থেকে শুরু করে পরীক্ষার্থী সবাই দুর্বৃত্তায়িত।অন্যদিকে বিএনপি জামাত তো আছেনই তেলা চুলে তেল দেয়ার জন্য।

    Like

  2. Dear Sir: enlightening article. But I thought you would also include the shameless activities carried out by both teachers and students in the exam halls during the board exams.

    Like

  3. আমাদের উচিৎ সকল পর্যায়ের শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। একদিনে ফলাফল পাওয়া যাবেনা। বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। এরা কেউই সৃজনশীলতার মানে বোঝেনা। শিক্ষকরাও তাদের সন্তানদের জন্য গাইড বই কিনে আনে, কর্মকর্তারা নীতিনির্ধারকদের গালিগালাজ করে নতুন নীতি প্রণয়নের কারণে। “চেইঞ্জ ম্যানেজমেন্ট” প্রয়োগ করতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে…

    Like

  4. শ্রদ্ধেয় স্যারের কথার সাথে আমি আরো একটু সংযোজন করতে চাই।
    আমার খালাতো বোনের বড় মেয়েকে আমিই ক্লাস সিক্স থেকে পড়াচ্ছি। সে গত বছর JSC তে অংশ নিলো। আমার এক বান্ধবী টিউশনি করে ……………তাকেই বললাম, তুই তো অনেক ছেলে মেয়ে পড়াস …ওদের স্কুলের টেষ্ট পরীক্ষার প্রশ্নগুলো দিস তাহলে আমি আমার ছাত্রীকে চর্চা করার জন্য দিবো। সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো…………..প্রশ্ন না আমি তোকে এর চেয়েও ভালো জিনিস দিবো। পরীক্ষায় 100% কমনের নিশ্চয়তা!!! বললাম কি দিবি?……… বললো সাজেশন।
    মোহা ম্মদপুরের একটি স্বনামধন্য স্কুল তাদের স্কুলের পাশাপাশি একই নামে কোচিং এর বাণিজ্য চালাচ্ছেন। তারা নিজেরাই একটি সাজেশন প্রকাশিত করেছেন গত বছরের JSC পরীক্ষার জন্য। ও আমাকে এক কপি এনে দিলো। আমি দেখলাম যে বাছাই করা সব টপিকস।

    কপিটি আমি আমার বোনের মেয়ের হাতে দেইনি। আমার মনে হলো এটা হাতে পেলে ও শুধু এটাই পড়বে আর বাকি কিছু পড়বে না। যথা সময়ে পরীক্ষা দিলো এবং জিপিএ-5 পেলো। তবে গোল্ডেন পায়নি। যাই হোক সবাই খুশি…………ও খুশি….কিন্তু তার কয়েকদিন পরে পত্রিকায় একটা লেখা পড়ে সবার আনন্দ উবে গেলো। লেখাটা ছিলো পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও জিপিএ-5।

    স্যার এই কলিকালে পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে ও যারা জিপিএ -5 পাওয়া যায়, তাহলে পড়াশুনা করে জিপিএ পাওয়ার মূল্যায়ন কোন মাপ কাঠি তে করা হবে?………………………

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s