মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের অনুভূতি | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


আমার বন্ধু রাশেদ বইটি যখন লিখি, তখন আমি আমেরিকায়, দেশে আসব আসব করছি। দীর্ঘদিন থেকে সেই দেশে পড়ে আছি, প্রায় ১৮ বছর, কিন্তু লেখালেখি হয়েছে খুব কম। তার কারণও আছে। আমি এক রকম পাণ্ডুলিপি পাঠাই, অন্য রকম বই হিসেবে বের হয়ে আসে। একবার একটা বই ছাপা হয়ে এল, দেখে আমার আক্কেল গুড়ুম! আমার লেখার পুরো স্টাইল পাল্টে দেওয়া হয়েছে। পড়ে মনে হয় আমি লিখিনি, অন্য কেউ লিখেছে। দেশে প্রকাশককে ফোন করে কারণ জানতে চাইলাম। তিনি লেখালেখির সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে আমাকে জ্ঞান দিয়ে বিশাল একটা চিঠি লিখলেন। অনেক কষ্ট করে পরে আমি অন্য একজন প্রকাশক দিয়ে আমার স্বল্পজ্ঞানের বইটি আমার মতো করে লেখা হিসেবে বের করতে পেরেছিলাম।

এর মধ্যে একদিন নিউইয়র্কে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন করে আমাদের সবার প্রিয় একজন মানুষ। আমি একদিন খুব কুণ্ঠিতভাবে হুমায়ূন আহমেদের ভাই হিসেবে পরিচিত হতে গেলাম। দেখি, তিনি আমার যৎসামান্য লেখা দিয়েই আমাকে আলাদাভাবে চেনেন। শুধু তা-ই না, শহীদজননী আমার লেখালেখি নিয়ে খুব দয়ার্দ্র কিছু কথা বললেন। তখন হঠাৎ করে আমার আবার লেখালেখির জন্য একটা উৎসাহ হলো—এক ধাক্কায় দুই দুইটা বই লিখে ফেললাম। তার একটি হচ্ছে আমার বন্ধু রাশেদ।

এটা মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে লেখা একটা কিশোর উপন্যাস। এটা লেখার সময় আমি চেষ্টা করেছি সেই সময়ের ধারাবাহিকতাটুকু রাখতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ কিসের ভেতর দিয়ে গেছে, সেই ধারণাটাও একটু দিতে চেষ্টা করেছি। এমনিতে আমার কিশোর উপন্যাসের একটা ফর্মুলা আছে, সব সময়ই সেখানে একটা অ্যাডভেঞ্চার থাকে। আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমি আমার ছোট ছোট পাঠকের মনে কখনো কোনো কষ্ট দিই না। আমার বন্ধু রাশেদ লেখার সময় আমার মনে হলো, এই বইটি যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা, তাই যারা এটি পড়বে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ের একটু সত্যিকারের অনুভূতি পাওয়া দরকার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অচিন্তনীয় বীরত্ব আছে, আকাশছোঁয়া বিজয় আছে, আর সবচেয়ে বেশি আছে স্বজন হারানোর বুকভাঙা কষ্ট। তাই এই বইটাতে আমি খানিকটা কষ্ট ঢুকিয়ে দিয়েছি। এমনভাবে লিখেছি যেন যারা পড়ে, তারা মনে একটু কষ্ট পায়। আমি যেটুকু কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম, মনে হয় তার থেকে বেশি দেওয়া হয়ে গেছে, সেটি আমি বুঝেছিলাম আমার ছোট মেয়েটির একটা প্রতিক্রিয়া দেখে।

তখন আমি মাত্র দেশে ফিরে এসেছি। ছেলেমেয়ে দুজনেই ছোট তখনো। স্বচ্ছন্দে বাংলা পড়তে পারে না। আমাকে তাই মাঝে মাঝে আমার লেখা বই পড়ে শোনাতে হয়। একদিন আমি তাদের আমার বন্ধু রাশেদ পড়ে শোনালাম। পুরোটা শুনে আমার সাত বছরের মেয়েটি কেমন যেন অন্য রকম হয়ে গেল। চুপচাপ বসে থেকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমরা রাতে ঘুমিয়েছি, সে বিছানায় শুয়ে ঘুমহীন চোখে শুয়ে আছে।
গভীর রাতে সে উত্তেজিত গলায় আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। বলল, ‘আব্বু, তুমি একটা জিনিস জানো?’ আমি বললাম, ‘কী?’ সে আমাকে বলল, ‘বইয়ে লেখা আছে রাশেদকে গুলি করে মেরেছে। কিন্তু তার লাশ তো পাওয়া যায়নি!’ আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না সে কী বলতে চাইছে। কিন্তু তার কথায় সায় দিয়ে বললাম, ‘না, লাশ পাওয়া যায়নি।’ আমার সাত বছরের মেয়ের মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। বলল, ‘তার মানে বুঝেছ? আসলে রাশেদের গুলি লাগেনি। সে মারা যায়নি। পানিতে পড়ে সাঁতার দিয়ে চলে গেছে।’ আমি অবাক হয়ে আমার ছোট মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। রাশেদের শরীরে গুলি লাগেনি—সে মারা যায়নি। সাঁতরে সে চলে গেছে, সে বেঁচে আছে।’
আমার মেয়ের বুকের ভার নেমে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। গভীর একটা প্রশান্তি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে গেল।

আমার ছোট মেয়েটির মতো আরও কত শিশুকে না জানি আমি কষ্ট দিয়েছি! সম্ভব হলে সবাইকে বলে আসতাম যে রাশেদ মারা যায়নি। রাশেদরা আসলে কখনো মারা যায় না।

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ২১-০৩-২০১৩ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s