আবারও প্রতীক্ষা এক বছরের | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


দেখতে দেখতে গণিত অলিম্পিয়াডের ১০ বছর হয়ে গেল। মনে হয় মাত্র সেদিন শুরু করেছি। মুনির হাসান বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে, মায়েদের বলছে ‘আপনার বাচ্চাটাকে একটু ধার দেবেন? একবেলার জন্য?’ মায়েরা ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইছেন, ‘কেন?’ মুনির বলল, ‘গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য।’ মায়েরা আরও বেশি ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইছেন, ‘সেটা আবার কী?’
১০ বছর পর এখন আর কাউকে গণিত অলিম্পিয়াড বোঝাতে হয় না—আমরা অবশ্য গণিত অলিম্পিয়াডও বলি না, বলি গণিত উত্সব। প্রতিযোগিতাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গণিতের জন্য ভালোবাসাটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি একেবারে বাজি ধরে বলতে পারি, কেউ যদি আমাদের এই গণিত উত্সবে এসে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একটা দিন কাটায়, তাহলে দেশ সম্পর্কে তার ধারণাই পাল্টে যাবে। আমরা সবাই জানতাম লেখাপড়াটা করাতে হয় জোর করে, বাচ্চারা নিজ থেকে আগ্রহ নিয়ে করে আমোদ-ফুর্তি, খেলাধুলা! এখানে সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য—একেবারে ক্লাস থ্রির বাচ্চা থেকে শুরু করে কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী চলে এসেছে গণিত করার জন্য! যাঁরা এখানে আসবেন তাঁরা নিশ্চিতভাবে বলবেন, দেশে দুর্নীতি আছে, সন্ত্রাস আছে, বন্যা-ঘূর্ণিঝড় আছে, লোডশেডিং, ক্রসফায়ার আছে—কিন্তু তার থেকে বড় কথা, দেশে এই রকম শিশু আছে, কিশোর-কিশোরী আছে। তারা যখন দেশের দায়িত্ব নেবে, তখন আমরা ভয় পাব কিসে?
আমাদের আনন্দ সম্পূর্ণ আরও একটি ভিন্ন কারণে। শুরুতে সবাই ধরে নিয়েছিল ঢাকা শহরে কত নামীদামি স্কুল আছে, সেখানে কত সুখী পরিবারের সুখী ছেলেমেয়েরা পড়ে, তাদের কত সুযোগ-সুবিধা। ঘুরেফিরে সেই ছেলেমেয়েগুলোই নিশ্চয়ই ভালো করবে। আমরা কিন্তু সেটা দেখিনি—দেশের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা উঠে আসছে—কী চমত্কার একটা ব্যাপার। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও একটি তথ্য সবার কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছি। গণিত অলিম্পিয়াডে ভালো করার জন্য ফাটাফাটি মেধাবী ছেলেমেয়ের প্রয়োজন নেই। যার আগ্রহ আছে, যার উত্সাহ আছে গণিতের জন্য, যার ভালোবাসা আছে, যে পরিশ্রম করতে রাজি আছে, সে-ই বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে পৃথিবীর বিশাল অঙ্গনে যেতে পারবে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, আমরা মেধাবীর সংজ্ঞাটা পাল্টে দেব—আমাদের কাছে মেধাবী তারাই, যাদের ভেতর আছে উত্সাহ এবং যারা পরিশ্রম করতে রাজি আছে।
গণিত অলিম্পিয়াডের জাতীয় অনুষ্ঠানটি শেষ হয়েছে। আমাদের সবার বুকে চিনচিনে ব্যথা! এখন এক বছর অপেক্ষা করতে হবে সামনের বছরের গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য। কেমন করে এই এক বছর কাটাব?

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ১৯-০২-২০১২ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s