ঘুরে দাঁড়ানোর সময় | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


আমি সিলেটে থাকি, মাঝে মাঝেই ঢাকায় যেতে হয়। পুরোনো একটা লক্কড়ঝক্কড় মাইক্রোবাসে আমি ঢাকায় যাই। আমার ড্রাইভার, যে এখন আমার পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছে, খুব সাবধানে গাড়ি চালায়, কখনো কোনো ঝুঁকি নেয় না। তার পরও আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করি, বিশাল দৈত্যের মতো বাস-ট্রাক প্রতিমুহূর্তে অন্য গাড়িকে ওভারটেক করার জন্য আমাদের লেনে চলে আসছে, আর মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য আমাদের নিজের লেন ছেড়ে রাস্তার পাশে নেমে যেতে হচ্ছে। একবার-দুবার নয়, অসংখ্যবার। ঢাকা পৌঁছানোর পর কিংবা ঢাকা থেকে সিলেটে পৌঁছানোর পর আমি আমার মাকে ফোন করে বলি, নিরাপদে পৌঁছেছি। আমার মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমাতে যান।
অনেক দিন ভেবেছি, ব্যাপারটা নিয়ে কিছু একটা লিখি। তারপরই মনে হয়েছে, লিখে কী হবে। আমার মতো মানুষেরা, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করি, তাদের নিয়ে দেশের বড় বড় হর্তাকর্তার কতটুকু মাথাব্যথা আছে? দেশের মন্ত্রী আগে-পিছে পুলিশের গাড়ি নিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে যখন এই পথ দিয়ে যান, তাঁরা কি কখনো কল্পনা করতে পারেন দেশের এই রাস্তা কত বিপজ্জনক? একটিবার, শুধু একটিবার যদি আমি কোনো একজন মন্ত্রীকে আমার লক্কড়ঝক্কড় মাইক্রোবাসে বসিয়ে ঢাকা থেকে সিলেট কিংবা সিলেট থেকে ঢাকায় আনতে পারতাম, তাহলেই সবকিছু অন্য রকম হতে পারে!


গত বছরের ডিসেম্বর মাসে গণিত অলিম্পিয়াডে সিলেট থেকে কুমিল্লায় যাচ্ছি। ভাড়া গাড়ি, ড্রাইভার অপরিচিত, আমি খুব সতর্ক হয়ে ড্রাইভারের প্রতিটি ওভারটেক, প্রতিটি মোড় লক্ষ করছি। কিছু বোঝার আগে হঠাৎ করে সে সামনে আরেকটি বাস কিংবা ট্রাককে মেরে বসল। গাড়ি টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আমার একজন সহকর্মী নিজের সিট থেকে উড়ে গিয়ে জানালার কাচে পড়েছেন। মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো একটা গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছি আমাদের আহত সহকর্মীকে বাঁচানোর জন্য। দামি পাজেরো গাড়ি গতি কমিয়ে দুর্ঘটনায় টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া গাড়িটাকে একনজর দেখে হুশ করে বের হয়ে যায়, থামে না। শেষ পর্যন্ত থামল একটা ট্রাক। ট্রাক ড্রাইভারের পাশে বসিয়ে রক্তাক্ত সহকর্মীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তখন একবার ভেবেছিলাম কিছু একটা লিখি। পরে মনে হলো, কী হবে লিখে? প্রতিদিন কত মানুষ দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে, আমরা তো শুধু আহত হয়েছি!
গত বছর জুলাইয়ের শেষে আরিচার রাস্তায় দুর্ঘটনায় রিজিয়া বেগম আর সিদ্দিকুর রহমান মারা গেলেন। দুজনই অত্যন্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সিদ্দিকুর রহমান আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগে আরেকটা দুর্ঘটনায় তাঁর দুজন মেয়ে মারা গিয়েছিল। রিজিয়া বেগমকে আমি অনেক দিন থেকে চিনি। গণিত অলিম্পিয়াড যখন শুরু হয়, তখন রাজবাড়ীতে একটা অলিম্পিয়াডে তিনি এসেছিলেন। বিটিসিএলের বোর্ড মিটিংয়ে তাঁর সঙ্গে অনেক মিটিং করেছি। যখন শুনতে পেয়েছিলাম একজন রিজিয়া বেগম মারা গেছেন, তখন মনে মনে দোয়া করেছি যেন অন্য কোনো রিজিয়া বেগম হয়। কিন্তু আমার দোয়া কাজ করেনি। খবরের কাগজে তাঁর ছবি দেখে বুকটা ভেঙে গিয়েছিল। কী ভয়ংকর একটি দুর্ঘটনা! মনে হলো, খবরের কাগজে একটু লিখি। তারপরই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে বলেছি, কী হবে লিখে? আমি এই দুজনকে চিনি বলে কষ্ট পেয়েছি। প্রতিদিন যে কত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, তাদের আপনজনেরা কষ্ট পাচ্ছে, তখন কি আমি তাদের নিয়ে কিছু লিখেছি? সেই মৃত্যুগুলো কি শুধু একটা পরিসংখ্যান নয়?
জুলাই মাসের ১১ তারিখে মিরসরাইয়ে ট্রাক উল্টে ৪০ জনের বেশি বাচ্চা মারা গেল। কোনো মৃত্যুকেই কেউ কখনো গ্রহণ করতে পারে না, আর সেই মৃত্যু যখন হয় একটি শিশু কিংবা কিশোরের—তখন সেটি মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। আর সে রকম মৃত্যু একটি-দুটি নয়, ৪০টির বেশি। আমার অনেক বড় সৌভাগ্য, আমার টেলিভিশন নেই! যদি থাকত তাহলে টেলিভিশনে স্বজন হারানো কান্না দেখে, ফুটফুটে বাচ্চাগুলোর নিথর দেহ দেখে আমি নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে যেতাম। খবরের কাগজের পৃষ্ঠাগুলো দেখে আমার বুক ভেঙে গেছে। আমার মনে হয়েছে, পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশ হলে সেই দেশের যোগাযোগমন্ত্রী নিশ্চয়ই পদত্যাগ করতেন। সরকার টালমাটাল হয়ে যেত। আমাদের দেশে কিছুই হলো না। এই দেশ ৪০টি কিশোরকে ধীরে ধীরে ভুলে গেল। ভাবলাম, পত্রিকায় নিজের ক্ষোভটা লিখি—তার পরই মনে হলো, কী হবে লিখে?
আগস্টের ২ তারিখ ভোরবেলা আমার ফোন বেজে উঠেছে, আমার একজন সহকর্মী নরসিংদী বাস অ্যাকসিডেন্টের ভেতর থেকে ফোন করেছে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘স্যার, চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ!’ না, কোনো শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, একজন রিকশাওয়ালা আমার সহকর্মীকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে বের করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। তাকে বসিয়ে বলেছে, আমি যাই, অন্যদের নিয়ে আসি।’ আমাদের যোগাযোগমন্ত্রীদের দেখে (কিংবা নৌপরিবহনমন্ত্রী কিংবা অন্য মন্ত্রী) যখন আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলি, ঠিক তখনই আমরা দেখি, এই রিকশাওয়ালার মতো মানুষজন চারপাশে আছে বলেই দেশটি টিকে আছে। মন্ত্রী মহোদয়রা এই দেশটিকে ধরে রাখেন না—এই রিকশাওয়ালার মতো মানুষেরা দেশটাকে বুক আগলে ধরে রাখেন। আমার সহকর্মীকে ঢাকার হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করার সময় খবর পেলাম ১৬ জন মারা গেছে। অন্য সব দুর্ঘটনার মতো এটাও মুখোমুখি সংঘর্ষ। আমার মনে হলো, কিছু একটা লিখি। আবার মনে হলো, কী হবে লিখে? সেই একই দিনে একই রাস্তায় অন্য একটি দুর্ঘটনায় আরও একটি পরিবার শেষ হয়ে গেছে, আমি কি তাদের নিয়ে দুর্ভাবনা করেছি? করিনি। স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের আপনজনের কথা লিখব?
আগস্টের ১৩ তারিখ একটা আনন্দানুষ্ঠানে বসে আছি। তখন একটা এসএমএস এল, গাড়ি দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ মারা গেছেন। দুর্ঘটনায় আহত হলে যত কমই হোক, কিছু একটা আশা থাকে—‘মারা গেছে’ কথাটি এত নিষ্ঠুর, সবকিছু শেষ। আমার পাশে আমার স্ত্রী বসে ছিল। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ আমাদের বহুদিনের পরিচিত, সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসজীবন থেকে। তাকে খবরটা দিতে হবে—আমি তবু চুপচাপ বসে রইলাম। যদি পাঁচ মিনিট পরও দিই, তাহলে সে মানুষ পাঁচ মিনিট পরে কষ্ট পাবে!
আমি প্রতিদিন অনেকগুলো খবরের কাগজ পড়ি। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পরের দিন আমি খবরের কাগজগুলো পড়তে পারিনি। ভাঁজ করে সরিয়ে রেখেছি। যেন খবরের কাগজ সরিয়ে রাখলেই কষ্টটা সরিয়ে রাখা যায়। আমার মনে হলো, কিছু একটা লিখি। প্রথমবার আমি লিখতে বসেছি—কী লিখব? একটি কথাই লেখার আছে, যদিও আমি প্রতিটি ঘটনার সময় ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। আসলে এর একটিও কিন্তু দুর্ঘটনা নয়, প্রতিটি একধরনের হত্যাকাণ্ড।

২.
আমরা যে পাকিস্তানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের দেশকে স্বাধীন করেছি, সেটা হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি প্রতিদিন যখন খবরের কাগজ খুলি, তখন চোখে পড়ে পাকিস্তানের কোথাও না কোথাও কোনো জঙ্গি, কোনো তালেবান বোমা মেরে ৩০-৪০ জন মানুষকে মেরে ফেলেছে। পাকিস্তান নামক এই দুর্ভাগা দেশটিকে দেখে এখন আমার করুণা হয়।
আমাদের দেশে জঙ্গিদের উৎপাত নেই। খবরের কাগজে জঙ্গিদের খবর আসে না তা নয়; কিন্তু সেগুলো হচ্ছে তাদের ধরার খবর। এই দেশের মানুষ জঙ্গি বা মৌলবাদকে কখনো প্রশ্রয় দেয়নি, কখনো দেবে না। এই দেশে জঙ্গিদের হাতে প্রতিদিন ৩০-৪০ জন মানুষ নৃশংসভাবে মারা যায় না।
কিন্তু প্রতিদিন দুর্ঘটনায় ৩০-৪০ জন মারা যায়। তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কী থাকল? খবরের কাগজে মৃত্যুর খবরটা পরিসংখ্যান হিসেবে দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কখনো খেয়াল করি না যে প্রতিটা মৃত্যুই আসলে কোনো না কোনো পরিবারের আপনজন হারানোর হাহাকার। সেই হাহাকারগুলো কত মর্মন্তুদ হতে পারে, সেটা আমরা তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মুনীরের মৃত্যু দিয়ে বুঝতে পারি। দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মারা যায় দেশের সাধারণ মানুষ। একেকটি মৃত্যুতে একেকটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। যারা আহত হয়ে বেঁচে থাকে, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে একেকটি পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। এই দেশের অর্থনীতির ওপর এর চাপ নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু মানবিক বিপর্যয়ের কথাটি কি কেউ ভেবে দেখবে না?

৩.
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান কিছুদিন আগে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই ২৪ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স চেয়েছেন। তিনি নৌপরিবহনমন্ত্রী, যদি লঞ্চের সারেং চাইতেন, আমি বুঝতে পারতাম। রাস্তায় গাড়ি চালানোর ড্রাইভার চাওয়ার অধিকার তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন, আমি সেটা বুঝতে পারছি না। বিষয়টা অনেকটা অশিক্ষিত ২৪ হাজার মানুষকে স্কুলের মাস্টার করে দেওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আবদার করার মতো। (তিনি সম্ভবত যুক্তি দিতে পারতেন, মাস্টারদের লেখাপড়া জানতে হবে কে বলেছে? বইয়েই তো সব লেখা আছে, মাস্টাররা ছাত্রদের পেটাবে, ছাত্ররা পড়বে!)
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের কথায় দেশের মানুষ অসম্ভব বিরক্ত হয়েছে—পত্রপত্রিকা খুললে কিংবা কম্পিউটার স্পর্শ করলেই সেটা বোঝা যায়। আমি কিন্তু তাঁর কথায় খুব খুশি হয়েছি দুই কারণে। প্রথম কারণটি হচ্ছে, যে কথাটা দেশের মানুষকে বোঝাতে আমাদের জান বের হয়ে যেত, সেই কাজটি মন্ত্রী মহোদয় আমাদের জন্য খুব সহজ করে দিয়েছেন। আমরা এখন তাঁর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলতে পারি, এটাই হচ্ছে সমস্যা! একজন মন্ত্রী যদি বিশ্বাস করেন যে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িকে ডানে-বাঁয়ে নিতে পারাটাই হচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা, তাকে নিয়মকানুন কিছুই জানতে হবে না, গরু ও ছাগলের পার্থক্যটা জানলেই হবে, তাহলে আমরা কেন রাস্তাঘাটের বাস-ট্রাকের ড্রাইভারদের দোষ দিই? তাদের বেশির ভাগই তো গাড়িটা চালাতে পারে, ট্রাফিক আইন কী, সেটা কেন মানতে হবে তার বিন্দুবিসর্গ জানে না, জানার প্রয়োজন আছে, সেটাও জানে না। যারা জানত তাদেরও মন্ত্রী মহোদয় বলে দিয়েছেন, আর জানার প্রয়োজন নেই।
বেশ কিছুদিন আগে আমি নামীদামি একটা বাস কোম্পানির দামি ভলভো বাসে করে যাচ্ছি। দেখতে পেলাম, বাস ড্রাইভার অন্য গাড়ি ওভারটেক করার জন্য একটু পর পর পাশের লেনে উঠে সামনের দিক থেকে ছুটে আসা গাড়িকে সরে যেতে বাধ্য করছে। কিছুক্ষণ পর ব্যাপারটা আমার আর সহ্য হলো না, আমি ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বললাম, ‘এই বাম দিকের লেনটি আপনার, আপনি এই লেন দিয়ে যাবেন। ডান দিকের লেনটি যারা আসছে তাদের জন্য। কাউকে ওভারটেক করার জন্য আপনি ডান দিকের লেনে উঠতে পারবেন শুধু যখন এটা ফাঁকা থাকবে তখন। এই লেনে যদি একটা মোটরসাইকেলও থাকে, আপনি তখন ওখানে উঠতে পারবেন না। বুঝেছেন?’
বাসের ড্রাইভার কিছুক্ষণ আমার দিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল; তারপর বলল, ‘স্যার, আমি এত বছর থেকে বাস চালাই, আপনার আগে আমাকে কেউ এই কথা বলে নাই!’
আমি এবার ড্রাইভারের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এই হচ্ছে অবস্থা। আমাদের দেশে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সৃষ্টিকর্তার এই দেশের জন্য একধরনের মায়া আছে, সেই জন্য সংখ্যাটি মাত্র ৩০ থেকে ৫০। প্রকৃত সংখ্যাটি হওয়ার কথা তার থেকে ১০ গুণ বা ১০০ গুণ বেশি। এই দেশে প্রতিমুহূর্তে কোনো না কোনো রাস্তায় দুটি গাড়ি মুখোমুখি ছুটে আসতে আসতে শেষ মুহূর্তে একেবারে এক সুতো ব্যবধানে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে—পৃথিবীর আর কোথাও এত ভয়ংকরভাবে গাড়ি চালানো হয় না।
নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, ড্রাইভারদের লেখাপড়া জানার দরকার নেই, গরু ও ছাগলের পার্থক্য জানলেই হবে! (কেন গরু আর ছাগল বলেছেন, সেটি এখনো রহস্য, যদি বলতেন বাস আর ট্রাকের পার্থক্য জানলেই হবে কিংবা ক্যাব আর টেম্পোর পার্থক্য জানলেই হবে, কিংবা রিকশা আর স্কুটারের পার্থক্যটা জানলেই হবে—তাহলেও একটা কথা ছিল।) মন্ত্রী মহোদয় নিশ্চয়ই জানেন না গাড়ি চালানোর অন্তত দুই ডজন নিয়ম আছে, যেগুলো পড়ে শিখতে হয় (রাস্তায় কোন ধরনের চিহ্ন থাকলে কোন দিকে যেতে হয় ইত্যাদি)। অন্তত ৩০টা জরুরি আইন আছে, গতিসীমা লিখে দেওয়ার ব্যাপার আছে। যে মানুষটি লেখাপড়া জানে না এবং এই বিষয়গুলো না জেনে একটা ড্রাইভারস লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে একজন সন্ত্রাসীর হাতে একটা ধারালো কিরিচ তুলে দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? আমি এই কথাগুলো লিখছি এবং ভাবছি, কী বিচিত্র এই দেশ: একজন মন্ত্রী সম্পূর্ণ বেআইনি একটা বিষয়ের আবেদন করছেন এবং কেন তিনি সেটা করতে পারেন না, আমাকে সেটা লিখতে হচ্ছে! বেআইনি কাজ করা যদি অপরাধ হয়, তাহলে বেআইনি কাজ করার জন্য প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া কি অপরাধ নয়?
আমি বলেছিলাম নৌপরিবহনমন্ত্রীর এই বেআইনি আবদার শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম দুটি কারণে। প্রথম কারণটি বলা হয়েছে, দ্বিতীয় কারণটি খুবই সহজ। এই মুহূর্তে নানা কিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার খুব ঝামেলার মধ্যে আছে। গায়ে পড়ে আদিবাসী বিতর্কটা উসকে দিয়েছে, রাস্তাঘাট ভাঙা, ঈদে বাড়ি যাওয়ার কোনো উপায় নেই, সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের প্রিয় মানুষগুলোর মৃত্যু—সেই অবস্থায় নৌপরিবহনমন্ত্রীর উদ্ভট বক্তব্য। এই সরকার নিশ্চয়ই এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে—অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও দেশের মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে চাইছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সেই অপূর্ব সুযোগটি করে দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন নৌপরিবহনমন্ত্রীকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে সরিয়ে দিয়ে সারা দেশের মানুষের বাহবা পেতে পারেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যদি যোগাযোগমন্ত্রীকেও সরিয়ে দেন, তাহলে তো কথাই নেই। ঈদের ছুটিতে যারা বাড়ি যেতে পারবে না কিংবা যারা বাড়ি যেতে গিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে, অন্তত তাদের বুকের জ্বালা একটু হলেও মিটবে।
খবরের কাগজে দেখছি, সবাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই ঈদের উপহারটি চাইছে। আমার ধারণা, এটি আসলেই দেশের মানুষের জন্য চমৎকার একটা উপহার হতে পারে!

৪.
সড়ক দুর্ঘটনা—কিংবা যদি ঠিক ঠিক বলতে চাই, তাহলে, ‘সড়ক হত্যাকাণ্ড’ আমাদের দেশের অনেক বড় একটা সমস্যা। আমার মতে সবচেয়ে বড় সমস্যা। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বছরে ১২ থেকে ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা সড়ক হত্যাকাণ্ডে মারা যায় বলে জানা নেই। প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু আমরা সেটা নিয়ে বিচলিত হই না। হঠাৎ করে তারেক মাসুদ বা মিশুক মুনীরের মতো কোনো প্রিয়জন যখন মারা যায়, আমরা তখন চমকে উঠি। যেদিন মানিকগঞ্জের সেই দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন মারা গিয়েছিল, সেই খবরটির নিচে আরও একটি দুর্ঘটনায় আরও পাঁচজন মারা গিয়েছিল—সেই খবরটি কিন্তু আমাদের চোখেও পড়েনি। আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। সাধারণত এসব দুর্ঘটনায় সাধারণ খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষ মারা যায়, সেই মৃত্যুর কথা কারও চোখেও পড়ে না। তাই বছরে ১২ থেকে ২০ হাজার মৃত্যুর পরও কোনো সরকারের কোনো দিন টনক নড়েনি। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এই সরকারেরও টনক নড়বে না। যদি নড়ত, তাহলে যে দুজন মন্ত্রী দেশের মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছেন, তাঁরা নিজেরাই পদত্যাগ করে বিদায় নিতেন। সে রকম কিছু ঘটেনি। দেশের মানুষ শোকসভা, শোকমিছিল, মানববন্ধন করছে। আমি যে রকম খবরের কাগজে লিখছি, সে রকম কিছু অর্থহীন কথা লেখা হবে এবং একসময় সবাই ভুলে যাবে।
কিন্তু এ রকম হতে হবে কে বলেছে? অন্য রকম কিছুও তো হতে পারে? বছরের পর বছর হাজার হাজার মানুষ দুর্ঘটনায় মারা গেছে, লাখো মানুষ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়েছে, আমরা কেউ গা করি না। ইলিয়াস কাঞ্চন একা নিরাপদ সড়ক চেয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছেন, আমরা তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াইনি। তারানা হালিমকে আমি সংসদে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলতে শুনেছি, পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে মানুষ হত্যা করার লাইসেন্স দেওয়া হলে তিনি আমরণ অনশন করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। অন্যরা কোথায়? সরকার যেহেতু কিছু করবে না, তাহলে দেশের মানুষ কি সবাই মিলে একত্র হতে পারে না? পত্রিকায় হালকা কলম লেখা বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে সত্যিকারের বিশেষজ্ঞরা একত্র হতে পারেন না? ট্রাফিক আইন মানানোর জন্য পুলিশকে জোর করে হাইওয়েতে নামানো যায় না? একটা দুর্ঘটনা হলেই বাসমালিক, বাস ড্রাইভার, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়—সবার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না? আমি নিশ্চিত, সবাই মিলে একত্র হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিভীষিকাকে নিশ্চয়ই ঠেকানো সম্ভব।
মে মাসের শেষে আমি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। প্লেনে ওঠার সময় আমাদের ক্যাথরিনের সঙ্গে দেখা। ফুটফুটে বাচ্চাটিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে তারেক মাসুদের জন্য অপেক্ষা করছে। বিদেশি মেয়ে অথচ কী সুন্দর বাংলা বলে। বহুদিন থেকে তাকে আমরা আমার দেশের মানুষ হিসেবেই ধরে নিয়েছি। বাচ্চাটিকে আদর করে প্লেনে উঠেছি, একটু পর তারাও উঠেছে। তারেক মাসুদ পিঠে একটা ব্যাকপ্যাক নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই আমার শেষ দেখা।
তারেক-ক্যাথরিনের ছোট্ট বাচ্চাটি একদিন বড় হবে। আমার খুব ইচ্ছে, তখন তাকে আমরা বলব, ‘তুমি জানো, তোমার আব্বু ছিল অসম্ভব সুদর্শন একজন মানুষ! এই দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য তার বুকের মাঝে ছিল অসম্ভব ভালোবাসা। একদিন গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে সে তার প্রাণের বন্ধুদের নিয়ে মারা গেল। তখন সারা দেশের মানুষ খেপে উঠে বলল, এই দেশে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে আর কাউকে মরতে দেওয়া হবে না। দেশের মানুষ তখন পুরো দেশটাকে পাল্টে দিল। এখন আমাদের দেশে আর গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মানুষ মারা যায় না!’ আমরা তখন ছোট শিশুটির মাথায় হাত দিয়ে বলব, ‘তুমি তোমার আব্বুকে হারিয়েছ। কিন্তু তোমার আব্বুর জীবন দেওয়ার কারণে এই দেশের আর কোনো শিশুর আব্বু এভাবে মারা যায় না।’
আমার খুব ইচ্ছে, আমরা এই ছোট শিশুকে একদিন এই কথাগুলো বলি। সবাই মিলে চাইলে কি বলতে পারব না?

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ২৬-০৮-২০১১ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s