তেল গ্যাস কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন জরুরি – গোলাম রাব্বানী, মো. নুরুল ইসলাম, মুহম্মদ জাফর ইকবাল এম এম আকাশ ও এম শামসুল আলম


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের খনিজ সম্পদ অর্থাৎ তেল, গ্যাস, কয়লার মতো জ্বালানিসম্পদের মালিক জনগণ। আধুনিক অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী মালিকানার অর্থ ‘সম্পত্তির ওপর অধিকারের সমষ্টি’। অতএব, কোনো চুক্তির কারণে গ্যাসসম্পদের ওপর জনগণের সার্বিক অধিকারের যেকোনোটি; অর্থাৎ বিক্রয়ের অধিকার, ব্যবহারের অধিকার ও উত্তরাধিকারত্বের অধিকার খর্ব হলে সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়। বিগত নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে স্বাক্ষরিত পিএসসিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির কোনো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও পাইপলাইনে ভারতে গ্যাস রপ্তানির প্রচেষ্টায় জনগণের এই সাংবিধানিক অধিকার হুমকির সম্মুখীন হয়। দেশের সচেতন মানুষ তখন সুসংগঠিত হয় এবং আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে বিবিয়ানার গ্যাস ভারতে রপ্তানি হয়নি। আবার ২০০৫ সাল থেকে বিদেশি কোম্পানির মালিকানায় রপ্তানির উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উত্তোলনের প্রচেষ্টা এবং সে উদ্দেশ্য সফল করার জন্য কয়লানীতি প্রণয়নের তৎপরতাও আন্দোলনের কারণে ব্যর্থ হয়।

২.
১৯৯৭ সালের মডেল পিএসসিতে এলএনজি করে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ ছিল। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ক্ষণস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯৭ সালের তুলনায় ২০০৮ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে এলএনজি (তরলীকৃত) হিসেবে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রেখে মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুমোদন করে এবং সাগরের সর্বমোট ২৮টি গ্যাসব্লক একসঙ্গে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তাতে জনগণের মধ্যে প্রবল আপত্তি দেখা দেয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষকেরা গ্যাসব্লক ইজারা দেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত বলে জরুরি অবস্থার মধ্যে এ ধরনের কাজের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। ফলে নয়টি ব্লক একত্রে ইজারার জন্য চূড়ান্ত হলেও চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি।

৩.
সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ চায়। তাই সেই বিনিয়োগ আকর্ষণে গ্যাস ও কয়লা খাত উন্নয়নে গৃহীত নীতিমালায় গ্যাস ও কয়লা রপ্তানির সুযোগ রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বিদেশি বিনিয়োগে পিএসসির আওতায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন চলছে। রপ্তানিনীতি ২০০৯-১২-তে কোনো শর্ত ছাড়া উৎপাদিত গ্যাস বিদেশি বিনিয়োগকারীর মালিকানায় রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে মডেল পিএসসি ২০০৮-এ গ্যাস সরকার ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে সরাসরি বিক্রির সুযোগও বিনিয়োগকারী পাচ্ছে। মডেল পিএসসি ২০০৮-এর ১৫(৪) উপধারামতে, বিনিয়োগকারীর প্রাপ্ত ভাগের গ্যাস সরকার যদি না কেনে, তাহলে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি হতে পারে। তা না হলে এলএনজি হিসেবে রপ্তানি হবে। যেহেতু এই গ্যাস কেনা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, সেহেতু তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রাসায়নিক সার, ইস্পাত, সিমেন্ট—এমন সব পণ্য হয়ে অথবা সরাসরি এলএনজি হয়ে রপ্তানির সুযোগ এই মডেল পিএসসিতে রয়েছে। ফলে জনস্বার্থবিরোধী ওই বৈশিষ্ট্যের এবং রপ্তানিনীতি ২০০৯-১২-তে গ্যাস রপ্তানির আগাম অনুমোদন দেওয়ার কারণে মডেল পিএসসি ২০০৮ বাতিলের দাবি উঠেছে।

৪.
মডেল পিএসসি ২০০৮-এ বার্ষিক উৎপাদিত গ্যাসের ৫৫ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানি খরচের উসুল বাবদ পেতে পারে। বাকি ৪৫ শতাংশের অর্ধেক অর্থাৎ লাভ হিসেবে চিহ্নিত আরও ২২.৫ শতাংশ বিদেশি কোম্পানি নিজস্ব হিস্যা হিসেবে পাবে। সরকার নিজের অংশ হিসেবে পাবে বাকি অর্ধেক, অর্থাৎ ২২.৫ শতাংশ। ক্ষেত্রভেদে এর তারতম্য হবে। এই হিসাবে খরচ উসুলের সময় উৎপাদিত গ্যাসের ৭৭.৫ শতাংশের মালিক হতে পারে বিদেশি কোম্পানি।
এই গ্যাস বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের কাছে বিক্রি করার বিধান থাকলেই সরকার তা ক্রয় করবে এবং উৎপাদিত গ্যাসে জনগণের মালিকানা সংবিধানমতে নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানির প্রাপ্য ওই গ্যাস সরকার ছাড়া অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি কিংবা বিদেশে রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হলে সেই গ্যাসের অধিকার থেকে জনগণ বঞ্চিত হবে। মডেল পিএসসি ২০০৮-এর ১৫.৫.৪-এ এলএনজি রপ্তানির প্রশ্নে লেখা আছে, ‘Where Petrobangla has installed necessary facilities to transport and use gas to meet domestic requirements, Petrobangla shall be entitled at its option to retain in kind any Natural Gas produced up to Petrobangla’s share of Profit Natural Gas, but in no event more than twenty percent (20%) of the total Marketable Natural Gas.’ পেট্রোবাংলা পাইপলাইন নির্মাণ করতে পারলে বিদেশি কোম্পানি পেট্রোবাংলাকে সমুদ্রাঞ্চলে উৎপাদিত মোট গ্যাসের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ রাখার অধিকার প্রদান করবে, মডেল পিএসসি ২০০৮-এ এই ধরনের অঙ্গীকার থাকা সংবিধানের পরিপন্থী। ফলে এই পরিস্থিতি জনগণকে পিএসসিবিরোধী আন্দোলনে নামিয়েছে।

৫.
বিদেশি বিনিয়োগে কয়লা খাত উন্নয়ন এই একই পরিস্থিতির শিকার। বিদ্যমান আইন ও বিধান অনুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগে যদি কয়লা তোলা হয়, তাহলে রয়্যালটি হিসেবে সরকার পাবে সেই কয়লার ৬ শতাংশ বা তার সমতুল্য বাজারমূল্য। বাকি ৯৪ শতাংশ কয়লা পাবে বিদেশি বিনিয়োগকারী। যদি কয়লার পরিবর্তে কয়লার বাজারমূল্যে বিনিয়োগকারী রয়্যালটি পরিশোধ করে, তাহলে উৎপাদিত সমুদয় কয়লার মালিক হবে এই বিনিয়োগকারী কোম্পানি। কোম্পানির পাওয়া এই সমুদয় কয়লা সরকারের কাছে সরাসরি বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রির আইন বা বিধান থাকলেই এই কয়লার ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত হয়। অথচ এমন আইন বা বিধান না থাকায় উৎপাদিত শতভাগ কয়লার মালিক হতে পারে বিদেশি কোম্পানি। সেই কয়লা নিজস্ব মালিকানায় সরকারের পরিবর্তে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারে এবং বিদেশে রপ্তানি করতে পারে। ফলে গ্যাসের অনুরূপ এই কয়লাসম্পদ থেকেও জনগণ বঞ্চিত হবে। সংবিধান-পরিপন্থী এবং দেশের স্বার্থবিরোধী বলে এ অবস্থা গণ-আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে।

৬.
বর্তমান সরকারের আমলে ক্ষণস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক দরপত্রের মাধ্যমে ইজারার জন্য চূড়ান্তকৃত নয়টি ব্লকের বদলে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমানা বিরোধ এলাকা বাদে সাগরের দুটি গ্যাসব্লক বিদেশি কোম্পানিকে ওই পিএসসি মডেলের আওতায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারা চুক্তিতে ওই গ্যাসব্লক থেকে তোলা গ্যাসের বিনিয়োগকারীর অংশ কেনা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীর নিজস্ব মালিকানায় এলএনজি হিসেবে তা রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া সরকার ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে এই গ্যাস বিক্রির সুযোগও তাই বিনিয়োগকারীর রয়েছে। স্বাক্ষরিত পিএসসির ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিছুদিন আগে অগভীর সমুদ্রাঞ্চলের গ্যাস কেয়ার্নকে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়, ভবিষ্যতে দূরবর্তী সমুদ্রাঞ্চলে অবস্থিত ব্লকের জন্যও প্রথম পদক্ষেপে অনুরূপ সুবিধা প্রদানের জন্য এবং পরবর্তী পদক্ষেপে এলএনজি হিসেবে গ্যাস রপ্তানির জন্য সরকার চাপের সম্মুখীন হবে। আবার কয়লা তোলার ব্যাপারে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত খনি ও কয়লা রপ্তানির সুযোগ রেখে কয়লানীতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানিসম্পদ গ্যাস ও কয়লার ওপর জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব হতে পারে বলে গণ-আন্দোলন চলছে।

৭.
পিএসসির আওতায় বিদেশি বিনিয়োগকারীকে ভ্যাট, শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানাবিধ সুবিধা দেওয়া হয়। কারণ সরকার যেন তুলনামূলক কম দামে গ্যাস কিংবা কয়লা পেতে পারে। ফলে দেশীয় উৎপাদনে সরকার গ্যাস বা কয়লা কম দামে সরবরাহ করে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন-ব্যয় কমাতে পারে। জনগণ কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ পায়। কিন্তু ওই চুক্তিতে সুযোগ থাকায় সেই গ্যাস বা কয়লা যদি বিদেশি বিনিয়োগকারী তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি কিংবা বিদেশে রপ্তানি করে, তাহলে জনগণের কম দামে জ্বালানি পাওয়ার অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা খর্ব হয়। এই পরিস্থিতি থেকে জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য দরকার খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ বিল জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাস করিয়ে আইনে পরিণত করা।

৮.
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। জনশ্রুতি রয়েছে, এই সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারী ইউনোকলের প্রস্তাবে ভারতে গ্যাস রপ্তানি করতে রাজি না হওয়ায় বিদেশি কোম্পানির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। ফলে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি। উন্মুক্ত খনি ও কয়লা রপ্তানির প্রতিবাদে ফুলবাড়ীতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন তখনকার বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক মহাজোট সমর্থন দেয় এবং ২০০৬ সালের ২৮ আগস্ট সারা দেশে আহূত হরতালে সমর্থন দিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ায়। যেসব গণমুখী কার্যক্রমের কারণে জনগণ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় আনে, তার মধ্যে এসব কার্যক্রম অন্যতম। তাই আশা করা যায়, এই সরকারের হাতে খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন হবে এবং গ্যাস ও কয়লা রপ্তানির সুযোগ থাকবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীর মালিকানাধীন গ্যাস কিংবা কয়লা চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করা বাধ্যতামূলক হবে। সরকার ছাড়া কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে এই গ্যাস কিংবা কয়লা বিক্রির কোনো সুযোগ বিদেশি কোম্পানি পাবে না। ফলে জ্বালানিসম্পদের ওপর জনগণের অধিকার অটুট থাকবে। এ জন্য দরকার ব্যাপক গণ-আন্দোলন। সেই আন্দোলন বিগত জোট সরকারের আমলে হয়েছে; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হয়েছে এবং বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলেও হচ্ছে।

৯.
ইতিমধ্যে এই আন্দোলনের সফলতা অনেকখানি স্পষ্ট হয়েছে। ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস কিংবা কয়লা রপ্তানি না করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। গ্যাস কিংবা কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ বিল আইনে পরিণত হওয়ার বিষয়টি সংসদে প্রক্রিয়াধীন। উন্মুক্ত পদ্ধতি রেখে করা রপ্তানিমুখী কয়লানীতির ব্যাপারে সরকারের মনোভাব এখনো নেতিবাচক। একসঙ্গে নয়টি ব্লক ইজারার পরিবর্তে দুটি ব্লক ইজারা দেওয়ায় গ্যাস রপ্তানির ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তবে আরও সাতটি ব্লক হস্তগত করার জন্য যেহেতু সরকারের ওপর বিদেশি কোম্পানির অদৃশ্য চাপ অব্যাহত থাকবে, সেহেতু সেই চাপ মোকাবিলার জন্য গণ-আন্দোলন অব্যাহত থাকতে হবে। তাই এ আন্দোলনের ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। সেই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির চাপের মুখে সরকারকে যেন নতি স্বীকার করতে না হয় এবং সংবিধান অনুযায়ী গ্যাসসম্পদের ওপর জনগণের অধিকার যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে জন্য জ্বালানিসম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন সংসদে পাস হওয়া জরুরি।

১০.
তা ছাড়া কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমানে সাগরের গ্যাস তোলার ব্যাপারে বিদেশি কোম্পানির বিকল্প নেই। কিন্তু স্থলভাগের গ্যাস উত্তোলনের ব্যাপারে নতুন করে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কোনোভাবেই চুক্তি করা সমীচীন হবে না। কারণ দেশি কোম্পানির তুলনায় বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে অনেক বেশি দামে বিদেশি মুদ্রায় গ্যাস কেনায় গ্যাসের সরবরাহ-ব্যয় বাড়ে। তা ছাড়া সরবরাহকৃত গ্যাসে বিদেশি কোম্পানির গ্যাসের অংশ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায়ও গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে কারণে প্রস্তাবিত পিএসসি ২০১১ বিরোধিতার সম্মুখীন। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ফলে ২০১১ সালের ১৬ জানুয়ারি সৃষ্ট গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অধীনে জনগণের কাছ থেকে আসে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এই অর্থে দেশীয় কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়াই অনায়াসে স্থলভাগের গ্যাস তোলা সম্ভব। পেট্রোবাংলাকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এই অর্থ বিনিয়োগে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। রপ্তানির ঝুঁকি কমানোর জন্য এই কৌশল অপরিহার্য। যদি সাগরে গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ আবিষ্কার হয় এবং চাহিদার তুলনায় বেশি তোলার প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে দেশি কোম্পানি কর্তৃক স্থলভাগের গ্যাস উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করে রপ্তানির ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব। তাই স্থলভাগের গ্যাস উত্তোলনে দেশীয় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কয়লানীতি অনুমোদনের অজুহাতে কয়লা উত্তোলন বন্ধ না রেখে আমদানির পাশাপাশি ভূ-গর্ভস্থ পদ্ধতিতে দীঘিপাড়া ও খালাসপীর খনির কয়লা বিদেশি বিনিয়োগের অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব বিনিয়োগে উত্তোলন করতে হবে। গ্যাস বা কয়লার মতো জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করা হলে বিদ্যুৎ-সংকটের সমাধান হবে না। নিজস্ব জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল। জনস্বার্থে এমন সব সুযোগ সৃষ্টির জন্য একদিকে গ্যাস ও কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন দরকার, অন্যদিকে আমাদের নিজস্ব কর্তৃত্বে স্থলভাগে গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রয়াস অব্যাহত রাখা দরকার। তাই সরকারের কাছে আমরা আহ্বান জানাই:
(ক) সংসদে উত্থাপিত তেল-গ্যাস-কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ বিলটি অবিলম্বে পাস করা হোক।
(খ) নতুন অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য স্থলভাগের গ্যাসব্লক শুধু দেশীয় কোম্পানিকে দেওয়া হোক।
(গ) দেশীয় কোম্পানির গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাপেক্স, বিজিএফসিএল ও এসজিএফএল একীভূত করে একটি জাতীয় কোম্পানি গঠন করা হোক।
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী: সাবেক বিচারপতি।
মো. নুরুল ইসলাম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, বুয়েট।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, শাবিপ্রবি।
এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, ঢাবি।
এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, চুয়েট।

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ৩১-০৭-২০১১ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s