সৃজনশীল আনন্দ | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


এ বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর আমার মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে—ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করেছে, সেটি মূল কারণ নয়। মূল কারণ হচ্ছে, এই ছেলেমেয়েরা প্রথমবার পুরোপুরি সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়েছে। যার অর্থ পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর তারা মুখস্থ করে দেয়নি। নিজেরা ভাবনাচিন্তা করে দিয়েছে। আমাদের সবার মস্তিষ্ক নামে যে অমূল্য একটি জিনিস আছে, যেটা আমরা কাউকে ব্যবহার করতে শেখাই না, এখন আমরা সবাইকে সেটা ব্যবহার করতে শিখিয়েছি। আমি জানি, আমাদের ছেলেমেয়েরা মহা খুশি, মস্তিষ্ক ব্যবহার করার কী আনন্দ তারা সেটা টের পেতে শুরু করেছে। মন-মেজাজ মোটেই ভালো নয় নোট-গাইড ব্যবসায়ীদের। মন-মেজাজ আরও বেশি খারাপ কোচিংওয়ালাদের। পত্রপত্রিকায় বড় বড় করে লেখা হয়েছে, এসএসসি পরীক্ষার কোনো প্রশ্ন কোনো নোট গাইড থেকে আসেনি! কোনো কোচিং সেন্টার কোনো সাজেশন দিতে পারেনি! দেশের ছেলেমেয়েরাও বুঝে গেছে সরকার থেকে বিনা মূল্যে তাদের যে বইগুলো দেওয়া হয় সেটাই হচ্ছে সবকিছু! কেউ যদি সেই বইটি মন দিয়ে আগাগোড়া পড়ে তাহলেই হয়—আর প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে হয় না। অনেক চেষ্টা করেও যে নোট-গাইড ব্যবসায়ী আর কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করা যায়নি, এখন দেখতে দেখতে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
আরও আনন্দের কথা হচ্ছে, এই প্রথমবার দেখতে পাচ্ছি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ভালো করছে। একসময় তারা ভালো করত না, তাদের নোট বই-গাইড বই ছিল না, তাদের প্রাইভেট পড়ার সুযোগ ছিল না, কোচিংয়ের সুযোগ ছিল না—কীভাবে কোন প্রশ্ন মুখস্থ করে কত দ্রুত পরীক্ষার খাতায় উগলে দিতে হবে সেটা কেউ তাদের শিখিয়ে দেয়নি। তাই পরীক্ষার ফলাফল হতো খারাপ। এখন তাদের আর সেই ঝামেলা নেই—যে পাঠ্যপুস্তকটি হাতে আছে, সেটাই সবকিছু। বাড়িতে বসে আগা থেকে গোড়া সেটা পড়তে হবে, তাহলেই হবে—আর কিছু করতে হবে না, কী আনন্দ।
আমার আনন্দ অবশ্য এখনো পুরোপুরি আসেনি। ইংরেজি ও গণিত এখনো সৃজনশীল করা হয়নি। আমি কথাবার্তা বলে দেখেছি, এখানে এক ধরনের ষড়যন্ত্র আছে, গণিত সৃজনশীল করা যাবে না এ রকম একটা সিদ্ধান্ত গেজেট করে ফেলা হয়েছে। যদিও কোনো মিটিংয়ে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গণিতের লেখাপড়া কীভাবে ঠিক করা যায় সেটা বের করার জন্য একটা শক্তিশালী কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটি অনেক গবেষণা করে খুব চমৎকার একটা রিপোর্ট দিয়েছে। তার মধ্যে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, গণিতকেও সৃজনশীল করতে হবে। সেই রিপোর্ট কাজে লাগাতে হলে গণিতকেও সৃজনশীল করতে হবে। যাঁরা ষড়যন্ত্র করছেন, তাঁরা নানা ফন্দি-ফিকির করতে থাকবেন। কিন্তু আমরা কচ্ছপের মতো কামড়ে ধরে ঝুলে থাকব গণিতকে সৃজনশীল না করা পর্যন্ত ছাড়ব না! ইংরেজির বেলায়ও একই ব্যাপার। আগে হোক পরে হোক সবকিছু সৃজনশীল হতে হবে!
পুরোটুকু পাইনি কিন্তু যেটুকু পেয়েছি সেই আনন্দটুকু আমি উপভোগ করতে চাই। এই দেশের সব ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমার আনন্দটুকু ভাগাভাগি করতে চাই—কেউ কোনো ষড়যন্ত্র করে সেই আনন্দ কেড়ে নিতে পারবে না।

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ১৮-০৫-২০১১ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s