৪০ বছরে পরিবর্তনটা বিশাল | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


৪০ বছর আগে বাংলাদেশে কম্পিউটার বলতে যা ছিল, তা কতকগুলো মেইন ফ্রেম কম্পিউটার, দুইটা কি তিনটা ছিল হয়তো। কার্ড পাঞ্চ করে অতি সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা সেই কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারতেন। বড় বড় গবেষক ও অভিজাত ব্যক্তি হয়তো কেবল সেই সুযোগ পেতেন। তার পরে আমরা এ দেশে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হতে দেখলাম। শুরুতে ব্যাপারটা ছিল কেবল সামর্থ্যবানদের জন্য। আজকে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত—সর্বত্র কম্পিউটার একটা নিত্যব্যবহার্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আমরা আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা, অফিস-আদালতের কাজ, হিসাব-নিকাশ, যোগাযোগ আর প্রকাশনার কাজ—সবকিছুতে কম্পিউটার ব্যবহার করছি। ৪০ বছরে এটা নিশ্চয়ই একটা বড় অর্জন।
আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়েও খুব ভালো করছে। কেবল দেশে এ ধরনের প্রতিযোগিতাগুলোয় অংশ নেয় তা নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও (এসিএম আইসিপিসি) তারা অংশ নিচ্ছে নিয়মিত এবং অর্জন করছে সাফল্য। স্পেনের ভ্যালাদোলিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে অনলাইন প্রোগ্রামিংয়ের প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়, তাতে নিয়মিত বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা অংশ নেয় এবং তারা ভালো করে। আরেকটা জিনিস খুব ভালো লাগে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো আমরা ইন্টারনেটে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে ফেলতে পারি। আগে এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল পেতে আমাদের কত না কষ্ট করতে হতো। এখন সেটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও একজন পরীক্ষার্থী সহজেই ইন্টারনেটে পেয়ে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিসংক্রান্ত আবেদনপত্র যেন ইন্টারনেটে বা মোবাইল ফোনে সহজেই জমা দেওয়া যায়।


গত নির্বাচনের আগে একটা চমৎকার কাজ হয়েছে, আমরা একটা জাতীয় পরিচয়পত্র খুব অল্প সময়ে হাতে পেয়ে গেছি। এখন আমরা আশা করছি, আগামী নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রে ভোট দিতে পারব। আমরা যে গণিত অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে থাকি, তার প্রতিযোগীরা ভোটযন্ত্র প্রবর্তনের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছে বলে ব্যাপারটা আমি আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করছি।
আরেকটা বিপ্লব এ দেশে ঘটে গেছে যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আমি যখন আমেরিকা থেকে দেশে আসি, তখন এ দেশে টেলিফোন বিষয়টা ছিল একটা মহার্ঘ ব্যাপার। খুব অল্পসংখ্যকের কাছে ছিল ফোনের সংযোগ, ফোন যেন ছিল সোনার হরিণ। এখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোকের হাতে মোবাইল ফোন। এমন কেউ সম্ভবত নেই, যার সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ করা যায় না। মোবাইল ফোন কেবল কুশল বিনিময়ের জন্য ব্যবহূত হচ্ছে না, সৃজনশীল নানা কাজে এর ব্যবহার চলছে। প্রবাসী দেশপ্রেমিক শ্রমজীবী মানুষ তাঁর নিকটজনের কাছে অজপাড়াগাঁয়ে টাকা পাঠানোর জন্য যেমন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন, তেমনি কৃষিজীবী মানুষ তাঁর কৃষিতথ্য জোগাড় করার কাজেও এ যন্ত্র ব্যবহার করতে পারছেন। যেকোনো সময় খবর শোনার কাজ থেকে শুরু করে ইংরেজি শেখার কাজে মোবাইল ফোন ব্যবহূত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মোবাইল ফোন গতি আনছে, আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ দেশে বিপ্লব ঘটে গেছে, এটা আমাদের অর্থনীতি থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক উন্মোচন করছে, সুশাসন, স্বচ্ছতার জন্যও এই খাত অবদান রাখছে। বাংলাদেশের মানুষের সৃজনশীলতার ওপর আমার বিশ্বাস অপরিসীম। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্ষেত্রটিকেও আমরা দেশ গড়ার জন্য সৃজনশীল উপায়েই ব্যবহার করতে পারব বলে আমার দুর্মর বিশ্বাস।

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ০১-০১-২০১১ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s