স্বপ্নের দেশটাকে দেখতে পাচ্ছি | মুহম্মদ জাফর ইকবাল


mzi-001

তারুণ্যের বিষয়টা বোঝার জন্য বাংলাদেশ খুব চমৎকার একটা উদাহরণ হতে পারে। পাকিস্তান স্থাপনার এক বছরের ভেতর এই দেশের তরুণেরা সেই রাষ্ট্রের স্থপতির মুখেল ওপর বলে দিয়েছিল উর্দুকে এই দেশের রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না। যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে এখন সারা পৃথিবীর মানুষ মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে, সেই দিনটিও তৈরি করেছিল এই দেশের তরুণেরা। ষাটের দশকে পাকিস্তানের মিলিটারি শাসকেরা যখন এই দেশের সব রাজনৈতিক নেতাকে জেলে আটকে রেখেছিল, তখন এই তরুণ ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করে তাঁদের মুক্ত করেছে। বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর ঐতিহাসিক ছয়দফা নিয়ে দেশের মানুষকে একতাবদ্ধ করছেন, তখন ছাত্রছাত্রীরা তাদের নিজস্ব ১১ দফা নিয়ে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল (আমার খুব ইচ্ছে ক্যানটিনে ফাউ খাওয়া আজকালকার ছাত্রনেতারা যেন একবার হলেও সেই ১১ দফাগুলো একটুখানি পড়ে দেখে!)। সত্তরের নির্বাচনের পর যখন পাকিস্তানি মিলিটারিরা ঠিক করল বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা দেবে না, তখন সারা দেশে যে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পেছনেও বড় শক্তি ছিল এই দেশের তরুণেরা। ২৫ মার্চ পাকিস্তানিরা যখন এই দেশে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল, তখন হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল এই দেশের তরুণ-ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক। নয় মাসের ভেতর শেষ করে দেওয়া সেই মুক্তিযুদ্ধটির দিকে এখন আমরা কত সহজে ফিরে তাকাই, কিন্তু যারা একাত্তরের ভেতর দিয়ে এসেছে, শুধু তারাই জানে সেটি ছিল কত বড় দুঃসময়, কত বিশাল আত্মত্যাগ করে স্বাধীনতা পেতে হয়েছে। সেই সময় এই দেশের তরুণেরা যদি বিজ্ঞ মানুষের মতো হিসাব করতে বসত, যদি যাচাই করে দেখত সাফল্যের সম্ভাবনা কতটুকু, যদি অস্ত্র হাতে নেওয়ার আগে ইতস্তত করত তাহলে কি আমরা এই দেশটাকে পেতাম? পেতাম না। আমাদের খুব সৌভাগ্য, এই দেশের তরুণেরা বেহিসেবী আবেগে দেশের জন্য ভালোবাসায় অকাতরে প্রাণ দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিল।


তারপর কতকাল কেটে গেছে। দেশটি কত কানাগলিতে ঘুরপাক খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত সঠিক রাস্তায় উঠে দাঁড়িয়েছে। দেশ যদি হতো ট্রেনের মতো আর সেটাকে যদি রেললাইনের ওপর তুলে দেওয়া যেত, তাহলে কোনো ভাবনা ছিল না, আজ হোক কাল হোক, রেললাইন ধরে ট্রেনটা ঠিক তার গন্তব্যে পৌঁছে যেত। কিন্তু দেশ হচ্ছে গাড়ির মতো, সেই গাড়ির একজন ড্রাইভার থাকে, সতর্ক না থাকলে ড্রাইভার বড় রাস্তা ছেড়ে গলিতে ঢুকে পড়ে, অপথে-কুপথে যেতে থাকে, রাস্তা ছেড়ে খাদে নেমে পড়ে (পাকিস্তানে যেমন হচ্ছে, এই খাদ থেকে তারা উঠতে পারবে?)! ড্রাইভার যদি ভালো হয়, তাহলে খানাখন্দ পেরিয়ে ভাঙ্গা রাস্তা দিয়েও গাড়িকে সামনে নেওয়া যায়। আমরা সবাই অনেক আশা নিয়ে রাস্তার শেষ প্রান্তে তাকিয়ে আছি, আবছা আবছাভাবে সেখানে আমাদের স্বপ্নের দেশটিকে দেখতে পাচ্ছি, খানাখন্দে ভরা রাস্তা, নড়বড়ে ব্রিজ-কালভার্ট পার হয়ে আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারব কি না সেটা অনেকাংশেই নির্ভল করছে আমাদের দেশের তরুণদের ওপর।
যত দিন আমরা নিজেদের একটা দেশ পাইনি, তত দিন আমাদের কী করতে হবে সেটা আমরা খুব স্পষ্টভাবে জানতাম। আমাদের তরুণেরাও জানত, তাই যখন দরকার হয়েছে তারা প্রতিবাদ করেছে, আন্দোলন করেছে, এমনকি যুদ্ধ পর্যন্ত করেছে। এখন আমাদের নিজের একটা দেশ হয়েছে। পাঁচ বছর পর পর ভোট দিয়ে একটা সরকার তৈরি করে দেওয়ার নিয়ম হয়েছে এখন আমাদের তরুণেরা কী করবে? গত নির্বাচনে এই তরুণদের ভোটেই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত হয়েছিল। সরকারেরও একটা দায়িত্ব আছে তরুণদের হাতে কিছু একটা তুলে দেওয়া। সেটা কী?
আমি যেহেতু শিক্ষক মানুষ, তাই ঘুরেফিরে সবার আগে শিক্ষার ব্যাপারটাই আমার চোখে পড়ে। আমি জানি, আমাদের দেশের লেখাপড়াটা শুধু যে ঠিক নেই, তা নয়, এটি খুব বিপদের মধ্যে আছে। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটা দাঁড় করানো হয়েছে মগজের মধ্যে জোর করে কিছু একটা ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত সব জায়গায় এই একই ব্যাপার ঘটে। আমরা ছেলেমেয়েদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে দিই না, তারা কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে রাখে, পরীক্ষায় ঘুরেফিরে সেই প্রশ্নগুলো আসে, যে যত নিখুঁতভাবে সেই উত্তরগুলো মুখস্থ লিখে আসতে পারে, তার পরীক্ষার ফল তত ভালো হয়। শুধু যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা হয়, তা নয়, বিসিএস বা এই ধরনের পরীক্ষাতেও সেই একই জিনিস পরীক্ষা করা হয়, কে কত বেশি তথ্য মাথার মধ্যে ঠেসে রাখতে পারে! কত নিখুঁত ভাবে সন- -তারিখ-সংখ্যা মুখস্থ রাখতে পারে।
আসলে লেখাপড়াটা মোটেও সেই ব্যাপার নয়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, জ্ঞান থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কল্পনাশক্তি! অথচ আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটা তৈরি করা হয়েছে কল্পনাশক্তিকে গলাটিপে মারার জন্য। আমরা সেটা খুব ভালো করে টের পাই, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যখন আবিষ্কার করি, ষোল কোটি মানুষের দেশের গোটা ত্রিশেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা টেনেটুনে একটু জ্ঞান বিতরণ করি, সারা পৃথিবীকে দেওয়ার জন্য একটু জ্ঞান তৈরি করতে পারি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো গবেষণা শুরু হয়নি। এখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্র, যখন পাশাপাশি নিয়মিতভাবে গ্রাজুয়েট ছাত্র নেওয়া হবে, যখন তারা মাস্টার্স-পিএইচডি করতে শুরু করবে তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যখন উঠেছে তখন সেখানে ভর্তি হওয়ার কথাটিও সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যায়। দেশে এখন এতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যে ছাত্রছাত্রীদের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগটিও নেই। যদি আমাদের এই তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের বিন্দুমাত্র মমতা থাকত তাহলে তাদের জন্য এই ভর্তিপ্রক্রিয়াটি একটু সহজ করে দেওয়া যেত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সে রকম একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিষয়টি বিবেচনা করতেও আগ্রহ দেখায়নি। স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক কাউন্সিল, পরীক্ষার মান—এ রকম বড় বড় যুক্তি দেখানো হলেও মূল কারণটা ছিল অর্থনৈতিক! ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে টুপাইস কামাই করে নেওয়া। আমাদের দেশের সাংবাদিকেরা অনেক রকম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় শিক্ষকেরা একেকজন কত টাকা করে কামাই করেন তার ওপর একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সেটা দেশের অনেক মানুষের চোখ খুলে দিত।
এই সরকার আসার পর আমরা শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যাকে পেয়েছি তিনি শিক্ষার সমস্যাটুকু বোঝেন এবং খুব আন্তরিকভাবে তার সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বড় বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা চলছে, নতুন পরীক্ষাপদ্ধতি, নতুন পাঠ্যবই, নতুন শিক্ষক— সবকিছুরই আয়োজন করা হচ্ছে। আমরা তার সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটা বিষয় দেখতে চাই, সেটা হচ্ছে গবেষণা। এখন পর্যন্ত আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শেষ করে একটা ভালো চাকরি করার জন্য। তাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যানেজার হওয়ার অনেক আগ্রহ, কিন্তু বিজ্ঞানী হওয়ার আগ্রহ নেই, গবেষক হওয়ার আগ্রহ নেই। আমার খুব দুঃখ হয়, যখন দেখি আমাদের দেশের নতুন প্রজন্ম গবেষণার স্বাদটুকু একবারও অনুভব না করে তাদের জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে—তাদের কেউ কখনো বলে দেয়নি, প্রেম- ভালোবাসা-রোমান্সে যত আনন্দ, গবেষণার আনন্দ তার থেকে অনেক বেশি। আমরা যদি আমাদের দেশের তরুণদের সত্যিকারের শিক্ষা দিতে পারি, গবেষণার স্বাদ অনুভব করিয়ে তাতে নেশাগ্রস্ত করে ফেলতে পারি, তাহলে তার উত্তরে তো আমরাও পাল্টা কিছু চাইতে পারি। সেটা তাহলে কী হতে পারে?
আমার খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই—আমি শুধু একটি জিনিসই চাইব, সেটা হচ্ছে ভালোবাসা। দেশের জন্য একটুখানি ভালোবাসা! আমি জানি এই দেশের তরুণ ছেলেমেয়েরা যদি একটি বার এই দেশের ইতিহাসে চোখ বুলায়, তাদের বয়সী তরুণেরা কী গভীর ভালোবাসায় এই দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়ে দেশটিকে এনে দিয়েছে সেই শক্তিটি যদি একটিবার অনুভব করে তাহলেই সারাটি জীবন তারা বুকের ভেতর এই দেশের জন্য একটি গভীর মমতা লালন করে বেড়াবে।
আমি এই দেশের তরুণদের কাছে আরও একটি জিনিস চাই, আমি চাই, তারা তাদের জীবনটাকে পূর্ণাঙ্গ করুক। এই সময়টি ভালো নয়, সারা পৃথিবীতে এখন সবাইকে শেখানো হচ্ছে জীবনকে উপভোগ করার প্রয়োজন নেই—জীবনকে ভোগ কর! স্বার্থপর হলে দোষ নেই, অন্যকে গুঁড়িয়ে-মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে হবে, প্রতিযোগিতায় সবাইকে পেছনে ফেলে দিতে হবে। বলা হচ্ছে, নিজের জন্য যা কিছু সম্ভব অর্জন করতে হবে। কিন্তু আসলে সেটি তো সত্যি নয়। জীবনকে কেউ যদি সত্যিকারভাবে উপভোগ করতে চায়, তাহলে তাকে অন্যের জন্য কিছু একটা করতে হবে। যত দিন কেউ অন্যের জন্য কিছু একটা না করছে, তত দিন তারা সত্যিকারভাবে জানতে পারবে না, বেঁচে থাকার আনন্দটুকু কোথায়।
আমি আমার জীবনের খুব ছোট একটা উদাহরণ দিই—অনেক বার এটা আমি বলেছি, আরও একবার বেশি হলে ক্ষতি কী?
বেশ কিছুদিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র আমার কাছে এসেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তদান কর্মসূচি পালন করবে। আমাকে দিয়ে সেটা শুরু করতে চায়—তাদের ধারণা, আমি প্রথম রক্ত দিলে আমার দেখাদেখি আরও অনেক ছাত্রছাত্রী রক্ত দেবে।
আমি নেহাতই ভীতু মানুষ, জীবনে রক্ত দিইনি। আমার শরীর থেকে টেনে রক্ত বের করে নেওয়া হবে চিন্তা করেই আমার শরীর গুলিয়ে উঠে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের তো আর সেই কথা বলতে পারি না। তাই কাঁচপোকার পিছু পিছু তেলাপোকা যেভাবে যায়, আমি সেভাবে তাদের পিছু পিছু রক্তদান কর্মসূচির ক্যাম্পে হাজির হলাম। আমাকে শোয়ানো হলো, কনুইয়ের ওপর শক্ত করে বাধা হলো এবং আমি কিছু বোঝার আগেই পুট করে সুঁই ঢুকিয়ে রক্ত বের করে নেওয়া শুরু হলো।
আমি ভেবেছিলাম সেটি হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। কিন্তু দেখতে পেলাম সে রকম কিছু না। যারা ভলান্টিয়ার তারা হয়তো আমার আতঙ্কের কথা অনুমান করেছিল তাই নানা রকম গল্পগুজব করে সময়টা কাটিয়ে দিল। আমার ধারণা ছিল, শরীর থেকে এক ব্যাগ রক্ত নেওয়ার পর আমি নিশ্চয়ই মাথা ঘুরে পড়ে যাব। আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম না—ভেবেছিলাম বসতে পারব না। দেখা গেল বেশ সহজেই বসতে পেরেছি। আমাকে এক গ্লাস কোল্ড ড্রিংস খাওয়ানো হলো, তখন জানতে পারলাম এতেই যেটুকু রক্ত গিয়েছে তার ৮০ ভাগ অভাব পূরণ হয়ে গেছে। বাকি ২০ ভাগ সামনের দুই সপ্তাহে পূরণ হয়ে যাবে।
ধারণা ছিল, রক্ত দেওয়ার কারণে হয়তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব না, কিংবা সোজা হয়ে দাঁড়ালেও হাঁটতে পারব না। দেখা গেল, আমার আশঙ্কা ভুল, আমি দাঁড়াতে পারলাম, হাঁটতে পারলাম এবং রক্তদান ক্যাম্প থেকে হেঁটে ডিপার্টমেন্টে আসতে আসতে রক্ত দেওয়ার কথা ভুলেই গেলাম।
তখন আমার অসম্ভব আফসোস হলো, কেন কেউ আগে আমাকে বলেনি কাজটি এত সহজ। তাহলে তো আমি আমার সেই ১৮ বছর বয়স থেকে প্রতি চার মাস অন্তর রক্ত দিতে পারতাম। কত মানুষ তাদের কত বিপদে সেই রক্ত নিতে পারত, কে জানে হয়তো আমার রক্তের কারণে কারও প্রাণও বেঁচে যেতে পারত।
আমার গল্পটি কিন্তু শেষ হয়নি, মাত্র শুরু হয়েছে। আমার রক্ত নেওয়ার পর সপ্তাহ দুয়েক পর আমি রক্ত নেওয়া টিমের কাছ থেকে একটা টেলিফোন পেলাম, তাদের একজন বলল, ‘স্যার আপনি রক্ত দিয়েছিলেন মনে আছে?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, মনে আছে।’ ছেলেটি বলল, ‘আপনার রক্তের ব্যাগটি টাঙ্গাইল পাঠানো হয়েছে। সেখানে একজনকে আপনার এই রক্ত দেওয়া হয়েছে।’ আমার অজান্তেই আমার মুখে বিশাল হাসি ফুটে উঠল!
তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। দেশে নির্বাচনের প্রস্তুতি; সিপিডি একটা টিম করে দেশের নানা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নির্বাচনে দেশের মানুষের কী প্রত্যাশা সেটা নিয়ে আলোচনা করছে, তারা মাঝেমধ্যে আমাকে ডাকে। সময় পেলে আমি যাই।
একবার তাদের সঙ্গে যাচ্ছি, গন্তব্যস্থল টাঙ্গাইল। আমাদের গাড়ি টাঙ্গাইল শহরে পৌঁছামাত্রই আমার মধ্যে একটা বিচিত্র প্রতিক্রিয়া হলো, আমার মনে পড়ে গেল, আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছিলাম, সেই রক্তের ব্যাগ এই টাঙ্গাইল শহরে কাউকে দেওয়া হয়েছে। কী কারণ জানা নেই, হঠাৎ করে আমার বুক এক শ হাত ফুলে গেল, আমার ইচ্ছে হলো, গাড়ির জানালা খুলে আমি মাথা বের করে চিৎকার করে বলি, ‘হে টাঙ্গাইলবাসী, আমি তোমাদের শহরবাসীর জন্য এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছি।’ আমার সে কী ছেলেমানুষী আনন্দ। যাকেই দেখি, তাকেই মনে হয় সেই ব্যক্তিটি, যাকে আমার রক্ত দেওয়া হয়েছে। আমার মুখে তখন এ-গাল ও-গাল জোড়া হাসি, সেই আনন্দের হাসি থামাতে পারি না।
বিষয়টা খুবই ছেলেমানুষী এবং হাস্যকর কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আমি আমার জীবনে নিজের জন্য অনেক কিছু করেছি। এবং সেখানে হয়তো গর্ব-অহংকার আত্মপ্রসাদ হয়েছে কিন্তু এ রকম নির্ভেজাল ছেলেমানুষী আনন্দ কখনো হয়নি। তার কারণটি সহজ, এই ছোট থেকেও ছোট কাজটি আমি করেছি অন্যদের জন্য!
তাই আমি চাই, আমাদের দেশের তরুণেরা সেই ছেলেমানুষী কিন্তু একশ ভাগ খাঁটি আনন্দটুকু অন্তত একবার হলেও অনুভব করুক। দেশের সব তরুণ যদি তাদের জীবনে একবার হলেও অন্যের জন্য কিছু একটা করে, আমি জানি তাহলে দেশটাই অন্যরকম হয়ে যাবে। তার কারণটা খুব সহজ, কেউ যদি একবার অন্যের জন্য কিছু করার আনন্দ পেয়ে যায়, তাহলে তাকে আর থামিয়ে রাখা যায় না!

এডমিন নোট: লেখাটি প্রথম আলো‘তে ৪-১১-২০১০ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s